জার্মানি ফুটবল দল যেন এখন শুধুই অতীতের এক মলিন ছায়া। একের পর এক বিশ্বকাপ–ব্যর্থতার অতল গহ্বরে ঢাকা পড়েছে তাদের চার চারবারের বিশ্বজয়ের যাবতীয় গৌরব, দীর্ঘায়িত হচ্ছে চার দশকের সবচেয়ে বড় দুঃসময়। ২০১৪ সালে ব্রাজিলের মাটিতে নিজেদের চতুর্থ বিশ্বকাপ জিতেছিল ডাই ম্যানশাফটরা। এর পর থেকেই দলটিকে আর চেনা যাচ্ছে না।
২০১৮ এবং ২০২২ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল তারা। এবার কুরাসাওকে ৭–১ গোলে উড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে দুর্দান্ত শুরু করলেও, শেষ ৩২–এর (রাউন্ড অব ৩২) লড়াইয়ে পুঁচকে প্যারাগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে হেরে আরও একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছে দলটি।
দীর্ঘ ১২ বছরের মধ্যে বিশ্বকাপে এই প্রথম কোনো নকআউট ম্যাচ খেলতে নেমে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ফক্সবরোর বোস্টন স্টেডিয়ামে যে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ল, তা জার্মান ফুটবলের ইতিহাসে চূড়ান্ত পতন হিসেবে দেখছেন ফুটবল বোদ্ধারা।
স্বাভাবিকভাবেই এমন লজ্জাজনক বিদায়ের পর জার্মানির প্রধান কোচ ইউলিয়ান নাগলসমান পড়েছেন তীব্র তোপের মুখে। ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে সাংবাদিকদের একের পর এক প্রশ্নবাণে জর্জর হতে হয়েছে। সব সমালোচনার সামনে দাঁড়িয়ে এই ব্যর্থতা তিনি অকপটে মেনে নিয়েছেন। শুধু তা–ই নয়, ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে বাস্তব সত্য উগরে দিয়ে তিনি বলেন:
“আপনি যদি নকআউটের প্রথম পর্বের পরেই বিদায় নেন, তবে তা জার্মান ফুটবলের মর্যাদার সাথে কোনোভাবেই যায় না। এটি এখন টানা তৃতীয়বারের মতো কোনো বড় টুর্নামেন্ট থেকে আমাদের অকাল ছিটকে যাওয়া। তাই আমাদের এটা মেনে নিতেই হবে যে—আমরা আর বিশ্ব ফুটবলের প্রথম সারির বা পরাশক্তি দলগুলোর অংশ নই। আমি অত্যন্ত হতাশ।”
তবে দলের এমন যাচ্ছেতাই পারফরম্যান্সের পরেও হারের জন্য অতিরিক্ত সময়ে ভিএআর (VAR)-এ গোল বাতিলকে পরোক্ষভাবে দায়ী করেছেন কোচ। রেফারি ও প্রযুক্তির ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন, “অতিরিক্ত সময়ে জোনাথান টাহর করা দুর্দান্ত হেডারটি যেভাবে বাতিল করা হলো, সেই সিদ্ধান্তটি ছিল একদম একটি সস্তা রসিকতা।”
কাগজে-কলমে জার্মানি যোজন যোজন এগিয়ে থাকলেও, মাঠের ৯০ বা ১২০ মিনিটে ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ বা ২০১৪ সালের সেই লড়াকু ও অপরাজেয় ‘জার্মান মেন্টালিটি’র বিন্দুমাত্র দেখা মেলেনি। অথচ এই প্যারাগুয়েই গ্রুপ পর্বে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে কোনোমতে শেষ ৩২-এ জায়গা পেয়েছিল। কিন্তু মাঠে তারা জার্মানির বিশ্বসেরা তারকাদের এক ইঞ্চি জায়গাও ছেড়ে দেয়নি; বরং টাইব্রেকারে স্নায়ুযুদ্ধে জয় ছিনিয়ে নিয়ে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে এই ম্যাচটাকে অমর ও স্মরণীয় করে রেখেছে।
প্যারাগুয়ের শেষ পেনাল্টি শটটি জার্মানির জাল জড়াতেই বোস্টন স্টেডিয়ামে উপস্থিত লাতিন সমর্থকেরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। পরের রাউন্ডে শক্তিশালী ফ্রান্সের মুখোমুখি হতে হলেও বোস্টনের এই রূপকথা তাঁরা চিরকাল মনে রাখবে। অন্যদিকে, চরম লজ্জায় জার্মান ফুটবলাররা টাইব্রেকারের পর মাঠের মাঝখানেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন। জার্মানির সাবেক বিশ্বকাপজয়ী তারকা ক্লিন্সম্যান এই হারকে জার্মানির জন্য চরম ‘বিব্রতকর’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
জার্মানির এই ঐতিহাসিক পতনের পর ফুটবল বিশ্লেষক ও সমর্থকেরা অবিলম্বে নাগলসমানকে কোচের পদ থেকে বরখাস্তের দাবি তুলেছেন। তবে ম্যাচ শেষে নাগলসমান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি নিজে থেকে পদত্যাগ করবেন না।
তাঁর ভাষায়:
“ডিএফবি (জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন) যদি আমাকে চায়, আমি দায়িত্ব পালন করে যাব। আমি জানি, আজ যদি জার্মানিতে কোনো জরিপ করা হয়, তবে দেশের মানুষ আমার সম্পর্কে ইতিবাচক কোনো কথা বলবে না, এটাই স্বাভাবিক। অনেক মানুষ চান আমি চলে যাই, কিন্তু আমি এমন মানুষ নই যে কঠিন পরিস্থিতি দেখে পালিয়ে যাব। আমি আমার বসের কাছে আমার যুক্তিগুলো তুলে ধরব।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, দলটিতে আমূল পরিবর্তনের সময় এসেছে। তিনি বলেন, “সম্ভবত আমাদের কাঠামোতে একটি বড় পরিবর্তন দরকার। ভবিষ্যতের জন্য আমাদের কিছু স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে।” ২০১৮ সালে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে গ্রুপ থেকে বিদায়, ২০২২ সালেও একই ট্র্যাজেডি এবং ২০২৬-এ শেষ ৩২-এ প্যারাগুয়ের কাছে হার—ব্যর্থতার এই বৃত্ত ভেঙে জার্মানি কীভাবে পুনরায় ঘুরে দাঁড়াবে, তা এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।

