বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতির অঙ্গনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন চিত্রশিল্পী, পাপেট শিল্পের পথিকৃৎ এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার।তাঁর পরিচয় শুধু একজন শিল্পী হিসেবে নয়, বরং একজন চিরকিশোর মানুষ হিসেবেও। তিনি প্রায়ই বলতেন, “বড় হওয়া ভালো না, ছোট থাকাই ভালো” এই বিশ্বাসই যেন তাঁর পুরো জীবন ও সৃষ্টিকর্মের মূল দর্শনে পরিণত হয়েছিল।
শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাতে তিনি সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ কল্পনাশক্তি, সরলতা ও নির্মল আনন্দ হারিয়ে ফেলে। তাই বয়স বাড়লেও তিনি নিজের ভেতরের শিশুটিকে কখনো হারিয়ে যেতে দেননি। পাপেট, কার্টুন, ছবি আঁকা, শিশুদের জন্য অনুষ্ঠান সব ক্ষেত্রেই তিনি শিশুমনের ভাষায় কথা বলেছেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর তৈরি পাপেট চরিত্র ও শিশুতোষ অনুষ্ঠান একাধিক প্রজন্মের শৈশবকে রঙিন করে তুলেছে। তিনি মনে করতেন, শিশুদের আনন্দ দেওয়া মানেই ভবিষ্যৎকে সুন্দর করে গড়ে তোলা। তাই শিল্পকে তিনি কখনো কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করতেন।
একাধিক সাক্ষাৎকারে মুস্তাফা মনোয়ার বলেছিলেন, শিশুরা পৃথিবীকে সবচেয়ে নির্মল চোখে দেখে। তাদের কাছ থেকে বড়দেরও শেখার অনেক কিছু আছে। তাঁর মতে, মানুষের ভেতরের শিশুমন বেঁচে থাকলে সমাজে হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভাজন অনেকটাই কমে আসতে পারে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে পাপেট শোর মাধ্যমে শিশুদের মানসিক সাহস জুগিয়েছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পরও শিশুদের জন্য কাজকে নিজের জীবনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন। দেশজ সংস্কৃতি, লোককাহিনি এবং মানবিক মূল্যবোধকে শিশুদের কাছে সহজভাবে পৌঁছে দিতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এলেও তাঁর জীবনদর্শন এবং সৃষ্টিশীল কর্ম নতুন প্রজন্মকে সবসময় অনুপ্রাণিত করবে। “বড় হওয়া ভালো না, ছোট থাকাই ভালো”—এই একটি বাক্যই যেন তাঁর ব্যক্তিত্ব, শিল্পচিন্তা এবং জীবনবোধের সবচেয়ে সহজ অথচ গভীর পরিচয় হয়ে থাকবে।
তাঁর বিদায়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গন হারিয়েছে একজন কিংবদন্তিকে, কিন্তু শিশুদের প্রতি তাঁর অফুরন্ত ভালোবাসা, সৃজনশীলতা এবং জীবনকে নির্মল চোখে দেখার শিক্ষা আগামী দিনেও মানুষের হৃদয়ে অম্লান থাকবে।

