মাছ আমাদের খাদ্যতালিকায় একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর উপাদান হিসেবে সুপরিচিত। এতে রয়েছে উচ্চমানের প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন এ, ডি ও বি১২ এবং আয়োডিন ও ক্যালসিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ। নিয়মিত মাছ খাওয়া হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত করতে দারুণ সহায়ক।
তবে সব মাছ সব পরিস্থিতিতে সমান নিরাপদ নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে কম দামে মেলা কৃত্রিম উপায়ে বা খামারে চাষ করা তেলাপিয়া মাছ অনেক সময় শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চাষ করা তেলাপিয়া মাছ টক্সিন বা বিষাক্ত উপাদানে ভরপুর থাকে, যা শরীরে ক্যানসার, হৃদরোগ, হাঁপানি ও অ্যালার্জির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিউজ বাংলা১৮-এর এক প্রতিবেদনে এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

মূলত শেওলা, উচ্ছিষ্ট খাবার কিংবা দূষিত বর্জ্য খেয়ে দ্রুত বেড়ে ওঠে এই মাছ। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মাছ চাষের সময় দ্রুত বড় করার জন্য অনেক ক্ষেত্রে হাঁস, শুকর বা মুরগির বর্জ্য ও দেহাবশেষ খাবার হিসেবে দেওয়া হয়। এছাড়া তেলাপিয়া চাষের সময় অত্যধিক পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক, কীটনাশক ও রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যা মাছের শরীরে মারাত্মক রোগজীবাণু ও বিষাক্ত উপাদান তৈরি করে।
‘জার্নাল অফ ইমার্জিং টেকনোলজিস অ্যান্ড ইনোভেটিভ রিসার্চ’-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দূষিত জলাশয়ের তেলাপিয়ার শরীরে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, সিসা ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু জমা হয়, যা মানুষের খাওয়ার জন্য নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক বেশি। এগুলো দীর্ঘদিন শরীরে প্রবেশ করলে কিডনি, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্র চিরতরে বিকল হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (USDA) গবেষকদের দাবি, অস্বাস্থ্যকর খামারের তেলাপিয়া মাছ খেলে মানুষের ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে এশিয়া থেকে আমদানি করা কিছু তেলাপিয়ার শরীরে অত্যন্ত ক্ষতিকর রাসায়নিক মিলেছে।
উৎপাদিত তেলাপিয়ায় প্রাকৃতিক প্রোটিন কম থাকে। উল্টো এদের শরীরে ‘ডিবুটিলিঙ্ক’ নামের এক প্রকার রাসায়নিক জমা হয়, যা মূলত প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এটি মানবদেহে প্রবেশ করলে হাঁপানি ও তীব্র অ্যালার্জি তৈরি করে।
১১ গুণ বেশি ডাইঅক্সিন: খামারের তেলাপিয়ার শরীরে ‘ডাইঅক্সিন’ নামের পরিবেশ দূষণজনিত মারাত্মক রাসায়নিকের মাত্রা সাধারণ মাছের চেয়ে প্রায় ১১ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।
ওমেগা-সিক্সের আধিক্য: ২০০৮ সালের একটি গবেষণা পত্র অনুযায়ী, তেলাপিয়া মাছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-সিক্স ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। অতিরিক্ত ওমেগা-সিক্স শরীরে প্রবেশ করলে রক্তচাপ ও প্রদাহজনিত অসুখ (যেমন- বাত) বাড়ে, যা প্যারালাইসিস, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি করে।

ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ: অপরিচ্ছন্ন খামারের মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ‘স্ট্রেপ্টোকক্কাস’ ও ‘কলমনারিস’-এর মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, সমস্যাটি তেলাপিয়া মাছে নয়, বরং অনিয়ন্ত্রিত ও নোংরা চাষপদ্ধতিতে। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে বৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষ করা তেলাপিয়া অত্যন্ত পুষ্টিকর খাদ্য। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোও তেলাপিয়া খাওয়ার বিরুদ্ধে কোনো সাধারণ নিষেধাজ্ঞা দেয়নি।
নিরাপদে মাছ খাওয়ার জন্য চিকিৎসকদের পরামর্শ:
১. উৎস নিশ্চিত করুন: সর্বদা বিশ্বস্ত, পরিচ্ছন্ন ও অনুমোদিত খামার বা প্রাকৃতিক জলাশয়ের (নদী-বিল) মাছ কিনুন।
২. লক্ষণ দেখে কিনুন: দুর্গন্ধযুক্ত, অস্বাভাবিক রঙের বা হাত দিলে দেবে যায় (নরম) এমন বাসি মাছ কেনা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।
৩. ভালোভাবে রান্না: মাছ কাটার পর ভালোভাবে ধুয়ে সম্পূর্ণ সেদ্ধ বা কড়া করে রান্না করে খান, যাতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয়।
4. বৈচিত্র্য আনুন: প্রতিদিন একই ধরনের বা একই প্রজাতির মাছ না খেয়ে খাদ্যতালিকায় রুই, কাতলা, সামুদ্রিক মাছ বা ছোট মাছের বৈচিত্র্য রাখুন।

