সত্যজিৎ দাস, (মৌলভীবাজার):
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. মনছুর আলমগীরের বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতি,অনিয়ম এবং কলেজের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বিনষ্টের অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
অভিযোগে কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর মো. শরীফুর রহমান এবং রসায়ন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ও শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. রফি উদ্দিনকেও বিভিন্ন অনিয়মে সহযোগিতার অভিযোগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় সচেতন মহলের পক্ষ থেকে দুদকের হবিগঞ্জ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক বরাবর অভিযোগটি জমা দেওয়া হয়। অভিযোগপত্রে সরকারি তহবিল আত্মসাৎ ও আর্থিক অনিয়মের ১৬টি সুনির্দিষ্ট খাতের উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে,‘Dynamic Host BD’ নামে একটি অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অনুমোদনহীন অতিরিক্ত ফি আদায় করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ওই প্ল্যাটফর্ম থেকে অধ্যক্ষ অনৈতিকভাবে কমিশন গ্রহণ করছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য তিনটি নতুন বাস কেনার অনুমোদন থাকলেও মাত্র দুটি পুরোনো ও জরাজীর্ণ বাস কেনা হয়েছে,যা অল্প সময়ের মধ্যেই অচল হয়ে পড়ে। কলেজের প্রধান ফটকের অভিভাবক ছাউনি ও মুক্তমঞ্চ নির্মাণ প্রকল্পে প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও আনা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে,কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামান্য সংস্কার কাজ এবং কলেজের বিভিন্ন স্থানে ক্ষুদ্র মেরামতের নামে নিয়মিতভাবে অতিরিক্ত বিল দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
ক্রীড়া তহবিল নিয়েও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অভ্যন্তরীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার জন্য বরাদ্দ অর্থ উত্তোলন করা হলেও দীর্ঘ ছয় মাসেও বিজয়ীদের পুরস্কার দেওয়া হয়নি। একইভাবে ২০২৬ সালের বহিঃক্রীড়া অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্পন্ন করে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিএনসিসি ও রোভার স্কাউটের ইফতার বরাদ্দ থেকে জোরপূর্বক অর্থ উত্তোলন, স্বাক্ষর জালিয়াতি এবং শিক্ষক পরিষদের ইফতারের নামে একাধিক তহবিল থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়,২০২৫ সালের একটি অনুষ্ঠানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের পাঁচতারকা মানের হোটেলে অবস্থানের ব্যয় কলেজ তহবিল থেকে বহন করা হয়েছে। এছাড়া বার্ষিক মিলাদ মাহফিলের খাবার বিধিবহির্ভূতভাবে অধ্যক্ষের পরিচিত একটি রেস্তোরাঁ থেকে উচ্চমূল্যে ক্রয় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষা সফর ও একাডেমিক কার্যক্রমের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী,ডিগ্রি (পাস) কোর্সের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সফর এবং বাংলা বিভাগের সেমিনারের জন্য বই ক্রয়ের বরাদ্দ উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে কোনো শিক্ষা সফর অনুষ্ঠিত হয়নি এবং বইও কেনা হয়নি।
প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বিনষ্টের অভিযোগে বলা হয়েছে,অবসর গ্রহণের পরও প্রফেসর মো. রফি উদ্দিন নিয়মিত অধ্যক্ষের কার্যালয়ে অবস্থান করে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করছেন। এর ফলে শিক্ষকরা স্বাভাবিক দাপ্তরিক যোগাযোগে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন এবং শিক্ষা কার্যক্রমেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য,অভিযুক্তরা তাদের অনিয়ম আড়াল করতে আগামী জুন-জুলাইয়ের মধ্যে তড়িঘড়ি করে অডিট কার্যক্রম সম্পন্ন করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাই কলেজে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে এবং অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে দুদকের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হবিগঞ্জ সমন্বিত জেলা দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যালয়ের উপ-পরিচালক শোয়াইব আহমেদ বলেন,”অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছি। দ্রুততম সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
উল্লেখ্য,অভিযোগে উল্লিখিত বিষয়গুলো অভিযোগকারীদের দাবি। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য দুদক তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।

