বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বেইজিং সফরকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে একটি বড় মোড় হিসেবে দেখছে ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো। মোংলা বন্দরের অর্থনৈতিক অঞ্চল চীনের হাতে যাওয়া, স্পর্শকাতর তিস্তা নদী প্রকল্পে বেইজিংয়ের সম্পৃক্ততা, সম্ভাব্য সামরিক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারক ও কৌশলগত মহলে বেশ উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ যে ধীরে ধীরে চীনের দিকে কৌশলগতভাবে আরও ঝুঁকছে, তা এই অঞ্চলে ভারতের ঐতিহ্যগত প্রভাব বলয়ের জন্য একটি বড় নতুন চ্যালেঞ্জ। গত শুক্রবার (২৬ জুন ২০২৬) ভারতের বিভিন্ন মূলধারার গণমাধ্যমে এই সফরের প্রাপ্তি ও প্রভাব নিয়ে বিস্তর বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে।
ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়া এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের পাশে ১১০ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইপিজেড) গড়ে তোলার চুক্তি চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ ও চীন। অথচ এই জমিটি আগে ভারতের (হিরানান্দানি গ্রুপ) জন্য বরাদ্দ ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু না করায় ২০২৫ সালে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার সেই ভারতীয় বরাদ্দ বাতিল করে দেয়, যা এখন চীনের নিয়ন্ত্রণে যাচ্ছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতে, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলাকে ঘিরে চীনের এই প্রবেশ বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে বেইজিংয়ের কৌশলগত উপস্থিতি আরও মজবুত করবে। এটি পাকিস্তানের গোয়াদর থেকে আফ্রিকার জিবুতি পর্যন্ত চীনের বন্দর বিনিয়োগের ধারায় (স্ট্রিং অব পার্লস) একটি নতুন শক্তিশালী সংযোজন হতে পারে।
অন্যদিকে, ইন্ডিয়া টুডে আরও সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে—‘ভারতের কি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?’ পত্রিকাটির মতে, এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক প্রকল্প হাতছাড়া হওয়া নয়, বরং ভারতের পূর্ব উপকূলের কাছাকাছি চীনের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও বাণিজ্যিক উপস্থিতির দরজা খুলে দিতে পারে।
চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা ও সামগ্রিক পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বেইজিংয়ের সক্রিয় সহযোগিতা চেয়েছেন—এই বিষয়টি প্রায় সব ভারতীয় গণমাধ্যমেই প্রধান শিরোনাম হয়েছে।
দ্য হিন্দু তাদের বিশ্লেষণে জানিয়েছে, তিস্তা নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের বিরোধ অনেক পুরনো। শেখ হাসিনা সরকার ভারতের সঙ্গে দীর্ঘকাল সমঝোতার চেষ্টা করলেও বর্তমান সরকার ভারতের জন্য অপেক্ষা না করে চীনের সহায়তায় নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে চায়।
কূটনৈতিক পত্রিকা দ্য প্রিন্ট লিখেছে, তিস্তা প্রকল্প ভারতের কাছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ নদীটি পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিম হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং এর ভৌগোলিক অবস্থান শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর খুব কাছাকাছি। মাত্র ২১ কিলোমিটার চওড়া এই করিডোরটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের (সেভেন সিস্টার্স) সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থল যোগাযোগ পথ। ফলে সেখানে চীনের যেকোনো ধরনের কারিগরি বা অবকাঠামোগত উপস্থিতি নয়াদিল্লিকে নিরাপত্তার দিক থেকে চরম চিন্তায় ফেলছে।
এনডিটিভি ও ইন্ডিয়া টুডের তথ্য অনুযায়ী, এই সফরে বাংলাদেশ ও চীন মোট ১৩টি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করেছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নদী ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে এসব চুক্তি হয়েছে।
চীনা প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠকে চট্টগ্রাম ও মোংলায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়। এছাড়া প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর’ গড়ার প্রস্তাব এসেছে। ভারতীয় মাধ্যমগুলো বলছে, এটি আসলে ভারতের আপত্তির কারণে ঝুলে যাওয়া আগের ‘বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার’ (BCI-M) করিডোরের একটি সংক্ষিপ্ত ও ভারতকে বাদ দেওয়া সংস্করণ।
প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নতুন সমীকরণকে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে ভারতীয় মিডিয়া। এনডিটিভির দাবি, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্য চীন থেকে ২৪টি অত্যাধুনিক জে-১০সিই (J-10CE) মাল্টিরোল ফাইটার জেট কেনার পরিকল্পনা করছে ঢাকা। এটি বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ হবে এই মডেলের দ্বিতীয় বিদেশি ব্যবহারকারী। এছাড়া প্রথমবারের মতো ‘টু প্লাস টু’ (পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়) সংলাপ কাঠামোর মাধ্যমে দুই দেশের নিয়মিত আলোচনার বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আশ্বস্ত করে বলেছেন—‘চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সমর্থন দেয় এবং যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে।’ বেইজিংয়ের এই বক্তব্যকে সরাসরি ভারত ও আমেরিকার প্রতি বার্তা হিসেবে দেখছে ভারতীয় মাধ্যমগুলো।
আউটলুক ম্যাগাজিনের এক বিশেষ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লির উদ্বেগ মূলত অর্থনৈতিক নয়, বরং সম্পূর্ণ ভূগোল ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত। মোংলা বন্দর, তিস্তা নদী এবং লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিকে ঘিরে চীনা প্রকৌশলী ও প্রযুক্তির সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা ভারতের জন্য এক নতুন ও কঠিন সীমান্ত বাস্তবতা তৈরি করছে।
তবে ভারতও হাত গুটিয়ে বসে নেই। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দ্রুত পর্যটক ভিসা চালু করার ঘোষণা দিয়েছেন এবং দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি অত্যন্ত পরিপক্ব ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি (Balancing Act) অনুসরণ করতে চায়। ঢাকা অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য চীনের বড় বড় অর্থায়ন ও সহায়তা নেবে, আবার ভারতের সঙ্গে তাদের ভৌগোলিক বাস্তবতা, বাণিজ্য ও ঐতিহাসিক আত্মিক সম্পর্কও বজায় রাখবে। তবে বেইজিং ও দিল্লির এই অক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ কতখানি সুফল ঘরে তুলতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

