আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সুইজারল্যান্ডে চলমান দ্বিতীয় দফা আলোচনার আবহেই বিশ্ব ভূরাজনীতিতে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য সামনে আসছে। ল্যাটিন আমেরিকার প্রখ্যাত স্বাধীন সাংবাদিক পেপে এস্কোবার এবং একাধিক পশ্চিমা সামরিক বিশেষজ্ঞের সাম্প্রতিক কিছু দাবি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ও মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছে।
একদিকে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার একক আধিপত্য বা ‘হেজেমনি’র পতনের ইঙ্গিত—সব মিলিয়ে এক নতুন মেরুকরণের দিকে এগোচ্ছে বিশ্ব রাজনীতি।
১. সুইজারল্যান্ডে আসিম মুনিরকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ
ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিক পেপে এস্কোবারের এক চাঞ্চল্যকর দাবি অনুযায়ী, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিতে পর্দার আড়ালে মধ্যস্থতা করছে পাকিস্তান। আর এই আলোচনা ভেস্তে দিতে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা সুইজারল্যান্ডেই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। এস্কোবারের দাবি, পাকিস্তানের আলোচক দলের উচ্চপর্যায়ের সূত্রের বরাতে এই চাঞ্চল্যকর ছক উন্মোচন করেছেন তিনি। পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যকার এই কূটনৈতিক বোঝাপড়া কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না তেল আবিব।
প্রসঙ্গ ও তথ্য সংশোধন: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা-ইরান আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীদের পথ থেকে সরিয়ে দিতে ইসরায়েল এর আগেও নানা কৌশল নিয়েছে। তবে অতীতে ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানী মহসেন ফাখরিজাদেহ বা কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানির মতো ব্যক্তিত্বরা হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেও, আলী লারিজানি বা ইসমাইল খাতিবের মতো শীর্ষ ইরানি কূটনীতিক ও নীতিনির্ধারকেরা এখনো জীবিত থেকে ইরানের কৌশলগত চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন।
২. ১৫০ গুণ বড় সামরিক বাজেট বনাম অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল
আমেরিকান সামরিক বিশ্লেষক কর্নেল ম্যাকগ্রেগরের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট ইরানের চেয়ে প্রায় ১৫০ গুণ বড়। এমনকি সৌদি আরবের সামরিক বাজেটও ইরানের চেয়ে ১০ গুণ বেশি। অথচ এই বিপুল অর্থ খরচের পরও ইরানকে দমানো যায়নি।
ইরান নিজেদের তৈরি সাশ্রয়ী ও আধুনিক ড্রোন এবং নিখুঁত হাইপারসনিক মিসাইল প্রযুক্তির ওপর ভর করে এই মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত যুদ্ধে পরাশক্তিদের সামনে নিজেদের জয় সুনিশ্চিত করেছে। বিগত সংঘাতগুলো প্রমাণ করেছে, বিলিয়ন ডলারের পশ্চিমা সামরিক কাঠামোকে নিছক মেধা ও স্থানীয় প্রযুক্তির ‘অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল’ (Asymmetric Warfare) দিয়ে রুখে দিয়েছে তেহরান।
৩. মার্কিন ‘প্যাট্রিয়ট’ ব্যবস্থার কার্যকারিতা মাত্র ৫%!
আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে মিথ বা প্রচার ছিল, তা ভেঙে দিয়েছেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (MIT) অধ্যাপক টেড পস্তল। মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞ কর্নেল ড্যানিয়েল ডেভিসের শো-তে এসে রিয়াল-টাইম ডেটাসহ তিনি জানান:
যেখানে মার্কিন সরকার দাবি করে এসেছে তাদের প্যাট্রিয়ট মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম ৯০% কার্যকর;
সেখানে প্রকৃত বৈজ্ঞানিক ও যুদ্ধক্ষেত্রের ডেটা বলছে, এটি মাত্র ৫% কার্যকর।
যুগের পর যুগ ধরে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দিয়ে আমেরিকার কাছ থেকে এই প্যাট্রিয়ট সিস্টেম কিনে আসছিল, যা দিনশেষে আধুনিক ড্রোন ও ব্যালেস্টিক মিসাইলের সামনে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে তখন, যখন সাম্প্রতিক সংকটের মুখে আমেরিকা সৌদি আরব থেকে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে সরাসরি ইসরায়েলের সুরক্ষায় নিয়োজিত করেছে। এটি আরব বিশ্বের চোখ খুলে দিয়েছে এবং ওয়াশিংটনের ওপর তাদের অন্ধ বিশ্বাসে চিরড় ধরিয়েছে।
৪. যুক্তরাষ্ট্রে ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অপারেশনের শঙ্কা ও জনমতের বদল
ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক অ্যালেক্স ক্রেইনারের মতে, ইরান ও আমেরিকার এই সম্ভাব্য চুক্তি ঠেকাতে মরিয়া হয়ে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ স্টাইলের একটি ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ (False-flag) অপারেশন চালিয়ে তার দায় ইরান বা আরব দেশগুলোর ওপর চাপানোর চেষ্টা করতে পারে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান যুগ আর আগের মতো নেই। বিকল্প বা অল্টারনেটিভ মিডিয়া (যেমন এক্স, পডকাস্ট, স্বাধীন জার্নালিজম) এখন মূলধারার করপোরেট মিডিয়ার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। যেকোনো প্রোপাগান্ডা তারা মুহূর্তেই ধরে ফেলছে। এমনকি ফক্স নিউজের সাবেক জনপ্রিয় সঞ্চালক টাকার কার্লসনের মতো ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাও এখন আমেরিকার ‘ইসরায়েল ফার্স্ট’ নীতির তীব্র সমালোচনা করছেন। বর্তমানে আমেরিকার প্রায় ৭০ শতাংশ সাধারণ মানুষ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে মার্কিনীদের অন্ধ অর্থায়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
৫. আমেরিকার বিদায়: মধ্যপ্রাচ্যে আসছে নতুন ‘ন্যাটো’
পেপে এস্কোবারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ শক্তিগুলো—আইনত ইরান, তুরস্ক, মিশর, সৌদি আরব, কাতার এবং পাকিস্তান মিলে ন্যাটোর আদলে একটি নতুন আঞ্চলিক সামরিক জোট বা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স (Regional Alliance) গঠনের জন্য গুরুত্বের সাথে আলোচনা চালাচ্ছে।
এই ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী, জোটের কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে বাকি সব দেশ সম্মিলিতভাবে তার পক্ষে লড়বে। এই নতুন সমীকরণের অর্থ হলো—
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন একক সামরিক আধিপত্য বা ‘হেজেমনি’র চূড়ান্ত অবসান ঘটছে।
সুরক্ষার নামে আরব দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটি গেড়ে বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ব্যবসার দিন ফুরিয়ে আসছে।
আমেরিকার সমর্থন ছাড়া ইসরায়েলের নিজস্ব ভূরাজনৈতিক শক্তির আসল ফাঁকটি উন্মোচিত হয়ে পড়ছে।
জ্ঞান চর্চার জয়:
কানাডায় অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে বিশ্লেষকদের মূল আলোচনার বিষয়ই ছিল—“চার দশকের কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধের পরও ইরান কীভাবে এই সামরিক ও বৈজ্ঞানিক বিস্ময় তৈরি করল?” এর উত্তরে শিক্ষাবিদেরা একবাক্যে স্বীকার করেছেন, ইরান কখনো তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সাথে আপস করেনি। পশ্চিমাদের মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজস্ব মেধা ও বিজ্ঞানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কারণেই আজ তারা বিশ্বমঞ্চে একটি অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছে।

