আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানে হৃদ্যন্ত্র পরীক্ষা ও চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো কার্ডিয়াক ক্যাথেটারাইজেশন। তবে একসময় জীবন্ত হৃদ্যন্ত্রে নল প্রবেশ করানোর ধারণাকেই প্রায় অসম্ভব ও প্রাণঘাতী বলে মনে করা হতো।
এই ধারণা বদলে দেন জার্মান চিকিৎসক ভের্নার ফর্সমান, যিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আত্মপরীক্ষার মাধ্যমে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।
১৯২৯ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে জার্মানির এবারসভালডের একটি হাসপাতালে সার্জারি প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে কাজ করার সময় তিনি ধারণা দেন যে, হাতের শিরা দিয়ে সরু ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে তা হৃদ্যন্ত্র পর্যন্ত নেওয়া সম্ভব। তবে সে সময় চিকিৎসা মহলে প্রচলিত ধারণা ছিল, এ ধরনের চেষ্টা নিশ্চিত মৃত্যুর কারণ হতে পারে, ফলে তাকে অনুমতি দেওয়া হয়নি।
প্রচলিত বাধা উপেক্ষা করে ফর্সমান এক নার্সের সহায়তায় পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের শরীরেই পদ্ধতিটি প্রয়োগ করেন। তিনি নিজের হাতের শিরায় ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে ধীরে ধীরে সেটিকে হৃদ্যন্ত্রের দিকে এগিয়ে নেন এবং এক্স-রে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এর অবস্থান নিশ্চিত করেন।
প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার দীর্ঘ নলটি তার হৃদ্যন্ত্রের ডান অলিন্দ পর্যন্ত পৌঁছায়, এবং পরীক্ষাটি সফল হয়। তবে এই যুগান্তকারী আবিষ্কার শুরুতে চিকিৎসা মহলে স্বীকৃতি পায়নি; বরং তিনি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন এবং হৃদ্রোগ গবেষণা থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হন।
পরবর্তী সময়ে জীবনের নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি সাধারণ চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং যুদ্ধ শেষে সাধারণ জীবনযাপন করেন।
দীর্ঘ সময় পর তার গবেষণার ভিত্তিতে আধুনিক কার্ডিয়াক ক্যাথেটারাইজেশন পদ্ধতি উন্নয়ন করেন আন্দ্রে কুরনঁ ও ডিকিনসন রিচার্ডস। অবশেষে ১৯৫৬ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান ভের্নার ফর্সমানসহ এই দুই বিজ্ঞানী।
যে কাজ একসময় তাকে পেশাগত সংকটে ফেলেছিল, সেটিই পরবর্তীতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে বিপ্লব ঘটায় এবং হৃদ্রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার নতুন যুগের সূচনা করে।

