জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র হইচই ও উত্তপ্ত বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। আজ রোববার (২১ জুন ২০২৬) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনার সময় এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির অবতারণা হয়।
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ভাষণে বিরোধী দলের মিছিল নিয়ে অসত্য তথ্য উপস্থাপন করছেন। একই সাথে তিনি অভিযোগ তোলেন, প্রধানমন্ত্রী ঋণখেলাপিদের উৎসাহিত করছেন এবং তাদের ‘জমিদার’দের সাথে তুলনা করছেন। তাঁর এই বক্তব্য শুরু হতেই সরকারি দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে এবং চিৎকার করে তীব্র প্রতিবাদ জানাতে থাকেন।
হান্নান মাসউদের এই বক্তব্যের পর সংসদ কক্ষজুড়ে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিরোধী দল ও সরকারি দলের সদস্যরা পাল্টাপাল্টি যুক্তিতে লিপ্ত হন:
জয়নাল আবদিন ফারুক (বিএনপি): বিএনপির এই সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তা সংসদের কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ (বাদ) দেওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, “সংসদ নেতাকে উদ্দেশ্য করে এমন অসত্য বাক্য বা কটূক্তি করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।”
নাহিদ ইসলাম (বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ): জয়নাল আবদিনের বক্তব্যের জবাবে চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, “সংসদে প্রধানমন্ত্রীর যেকোনো বক্তব্যের সমালোচনা করার গণতান্ত্রিক অধিকার বিরোধী দলের আছে। আমরা সংসদে প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা করতে চাই, ফ্যাসিবাদের দিকে ফিরে যেতে চাই না।”
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (স্থানীয় সরকারমন্ত্রী): চিফ হুইপের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, “বিরোধী দলের সদস্য সরাসরি সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীকে ‘অসত্যবাদী’ বলেছেন, যা সংসদীয় রীতি অনুযায়ী কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” তিনি উল্টো বিরোধী দলের এই আচরণকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে হান্নান মাসউদের বক্তব্যের বিতর্কিত অংশটুকু অবিলম্বে এক্সপাঞ্জ করার জোর দাবি জানান।
বিতর্কের এক পর্যায়ে আবদুল হান্নান মাসউদ পুনরায় ফ্লোর (বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ) না পেয়েই মাইক ছাড়া খালি গলায় চিৎকার করে কথা বলতে শুরু করেন। এতে সংসদের শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হলে স্পিকারের আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল তাকে থামিয়ে দেন। তিনি কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়ে বলেন:
“এটি শাহবাগ চত্বর নয়, এটি পবিত্র জাতীয় সংসদ। এখানে নিয়ম-কানুন ও সংসদীয় রীতিনীতি মেনে কথা বলতে হবে।”
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সবশেষে আসরে নামেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বিষয়টি নিয়ে আর ‘জল ঘোলা’ না করার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানান। ডেপুটি স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “বাইরের রাজনৈতিক জবাব বাইরেই দেওয়া হবে। সংসদের ভেতরের পরিবেশ নষ্ট হয়, এমন কোনো ঝগড়ায় আমাদের না যাওয়াই উত্তম হবে।”
বিরোধীদলীয় নেতার এই গঠনমূলক বক্তব্যের পর সংসদের পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল তখন জানান, আবদুল হান্নান মাসউদের বক্তব্যটি কার্যবিবরণী ও সংসদীয় আইন অনুযায়ী বিচার-বিশ্লেষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

