সত্যজিৎ দাস, (মৌলভীবাজার):
চা-বাগানের সবুজ প্রান্তরজুড়ে তিন দিন ধরে বর্ণিল সংস্কৃতির যে উৎসবমুখর মিলনমেলা বসেছিল,তার সমাপনী দিন আজ রোববার (২১ জুন)। ‘বর্ণিল জীবন ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন’ প্রতিপাদ্যে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ফুলছড়া চা বাগান মাঠে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী ‘হারমোনি ফেস্টিভ্যাল সিজন-২’ শেষ হচ্ছে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উদ্যোগে আয়োজিত এ উৎসব শুরু হয় গত শুক্রবার। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর বিলুপ্তপ্রায় ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির সংরক্ষণ,পুনরুদ্ধার এবং টেকসই বিকাশের লক্ষ্যকে সামনে রেখে আয়োজন করা হয় এই ব্যতিক্রমী উৎসবের।
উদ্বোধনী দিনে বিকেলে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম। এরপর খাসিয়া শিল্পীদের মনোমুগ্ধকর নৃত্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। পর্যায়ক্রমে ত্রিপুরা,মনিপুরী,গারো,উরাও,চা-শ্রমিকসহ বিভিন্ন নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর শিল্পীরা নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থাপন করেন। স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশিত সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ধামাইল উৎসবকে এনে দেয় ভিন্নমাত্রা।
তিন দিনের এই আয়োজনে শুধু সাংস্কৃতিক পরিবেশনাই নয়,ছিল বৈচিত্র্যময় জীবনধারা ও ঐতিহ্যের প্রদর্শন। মনিপুরী তাঁতের শাড়ি,বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর ব্যবহার্য ও সৌখিন সামগ্রী,হস্তশিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্টলে দর্শনার্থীদের ছিল উপচে পড়া ভিড়।
এবারের উৎসবে বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি খাসিয়া,মনিপুরী,গারো,ত্রিপুরা,উরাও,শবর,গঞ্জু, কড়া,গৌড়,তেলেগুসহ ২৭টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অংশগ্রহণ করে। তারা নিজেদের ভাষা,সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস,নৃত্য,কারুশিল্প ও জীবনধারার নানা দিক তুলে ধরে দর্শনার্থীদের সামনে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন,ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে পর্যটন সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি বাংলাদেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‘হারমোনি ফেস্টিভ্যাল’ কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, এটি সম্প্রীতি,সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক অনন্য মিলনমেলা।
তিনি আরও বলেন,সিলেট অঞ্চলের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকার বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে পর্যটন অবকাঠামো,যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিমানবন্দর উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির,সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান ও হাজী মুজিবুর রহমান চৌধুরী। এছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়,বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার কমিউনিটি ট্যুরিজম,এথনিক ট্যুরিজম এবং ওয়াটার ট্যুরিজমের বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
সবুজ চা-বাগানের বুকে বৈচিত্র্যের রঙে রাঙা এই আয়োজন আবারও প্রমাণ করেছে, সংস্কৃতির ভিন্নতা বিভেদের নয়,বরং সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের শক্তিশালী সেতুবন্ধন।

