নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাবা দিবস এলেই পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ তাঁদের বাবার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানায়, ভালোবাসার কথা বলে,কৃতজ্ঞতার গল্প শোনায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে ওঠে শুভেচ্ছা আর আবেগের বাণীতে। কিন্তু এই দিনটি অনেকের হৃদয়ে এক ভিন্ন প্রশ্নও জাগিয়ে তোলে-সন্তান জন্ম দিলেই কি একজন মানুষ বাবা হয়ে ওঠেন?
জীববিজ্ঞানের ভাষায় সন্তান জন্মদানের জন্য একজন পুরুষের প্রয়োজনীয় শারীরিক সক্ষমতাই যথেষ্ট। কিন্তু পিতৃত্বের পরিচয় কি কেবল এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ? একজন সন্তানের জীবনে বাবার ভূমিকা কি শুধু জন্মদাতার পরিচয়ে শেষ হয়ে যায়? বাস্তবতা বলে,না।
একজন প্রকৃত বাবা সন্তানের জীবনে কেবল একটি নাম নয়,একটি আশ্রয়। তিনি সন্তানের নিরাপত্তা,শিক্ষা,নৈতিকতা,স্বপ্ন ও আত্মবিশ্বাসের অন্যতম ভিত্তি। সন্তান পৃথিবীতে আসার আগেই যার চিন্তায় সন্তানের ভবিষ্যৎ জায়গা করে নেয়,যিনি নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সন্তানের জন্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে চান,তিনিই প্রকৃত অর্থে বাবা।
আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা আমাকে এই উপলব্ধির সামনে দাঁড় করিয়েছে বহুবার। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। ফলে বাবার স্নেহ,শাসন কিংবা সান্নিধ্যের স্মৃতি আমার জীবনে প্রায় অনুপস্থিত। দেয়ালে ঝুলে থাকা একটি ছবিই ছিল বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্কের দৃশ্যমান প্রতীক। পৃথিবীতে জন্ম দেওয়ার জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা আছে,শ্রদ্ধা আছে,কিন্তু বাবাকে জানার বা বাবার জন্য কিছু করার সুযোগ আমার ভাগ্যে জোটেনি।
আমার মা-ই একসঙ্গে বাবা ও মায়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। সীমাহীন কষ্ট,সংগ্রাম আর ত্যাগের মধ্য দিয়ে তিনি সন্তানদের মানুষ করার চেষ্টা করেছেন। জীবনের অনেক বড় শিক্ষা আমি সেখান থেকেই পেয়েছি। তখনই বুঝেছি, দায়িত্ববোধই মানুষকে বড় করে,সম্পর্ককে অর্থবহ করে তোলে।
আমার বাবার জীবনও ছিল বৈচিত্র্যময় ও আলোড়নপূর্ণ। তিনি ছিলেন মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের বাবু’র বাড়ির প্রাক্তন সচিব প্রয়াত শশধর দাসের তৃতীয় পুত্র সমরজিৎ দাস,যিনি নেপাল নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। জীবনে বহু ব্যবসা করেছেন,বহুবার ব্যর্থ হয়েছেন,আবার শেষ সময়ে সাফল্যের মুখও দেখেছেন। তাঁর পরামর্শে অনেক মানুষ প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন,সমাজে নেতৃত্বের আসনে পৌঁছেছেন। প্রশাসনের নানা স্তরের মানুষের সঙ্গে তাঁর ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ।
কিন্তু একজন মানুষের সাফল্যের হিসাব সবসময় তার পারিবারিক দায়িত্বের সঙ্গে মিলে যায় না। সমাজের অনেক মানুষের জন্য পথপ্রদর্শক হওয়া সম্ভব হলেও নিজের পরিবারকে সেই আলো সবসময় দেওয়া যায় না। এই বৈপরীত্যই হয়তো মানবজীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতাগুলোর একটি।
বাবার মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া দায়-দায়িত্ব বহন করতে হয়েছে সন্তানদের। ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ থেকে শুরু করে নানা অসমাপ্ত কাজের ভার কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে। অথচ যাদের প্রতি তিনি আস্থা রেখেছিলেন,যাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল,তাঁদের অনেকেই সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করেননি। জীবনের এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাকে আরও একটি সত্য শিখিয়েছে-সম্পদ নয়,দায়িত্ববোধই মানুষের প্রকৃত উত্তরাধিকার।
গত রাতে আমার মেয়ে আমাকে ‘হ্যাপি ফাদার্স ডে’ লিখে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। উত্তরে তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। কিন্তু তারপর নিজের কাছেই প্রশ্ন করেছি,আমি কি সত্যিই একজন ভালো বাবা হতে পেরেছি? সন্তানের কাছে আমার দায়িত্ব কতটা পালন করতে পেরেছি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখেছি,জীবনের প্রতিটি মানুষের মতো আমিও অসম্পূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে চেষ্টা করেছি,অনেক ক্ষেত্রে সফল হয়েছি,আবার অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থও হয়েছি।
তবুও পিতৃত্বের সৌন্দর্য এখানেই যে এটি কোনো অর্জিত পদবী নয়;এটি প্রতিদিনের সাধনা। প্রতিদিন একটু বেশি দায়িত্বশীল হওয়া, একটু বেশি সময় দেওয়া,একটু বেশি বোঝার চেষ্টা করা এবং নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়ানোর নামই পিতৃত্ব।
আজ বাবা দিবসে পৃথিবীর সকল বাবাকে শ্রদ্ধা জানাই। বিশেষ করে তাঁদের,যারা সন্তানের জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেন,কষ্ট গোপন করেন, ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধে নেন এবং সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নীরবে সংগ্রাম করে যান।
একই সঙ্গে স্মরণ করি সেইসব সন্তানদেরও, যারা বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, দায়িত্বহীনতার যন্ত্রণা বয়ে বেড়িয়েছে অথবা খুব অল্প বয়সেই বাবাকে হারিয়েছে। তাদের জীবনও সংগ্রামের,তাদের গল্পও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সত্য কখনো বদলায় না-জন্ম দেওয়া সহজ,কিন্তু বাবা হয়ে ওঠা একটি আজীবনের দায়িত্ব। একজন মানুষ জন্মদাতা হতে পারেন মুহূর্তেই,কিন্তু বাবা হতে হলে প্রয়োজন ভালোবাসা,ত্যাগ,দায়িত্ববোধ এবং সন্তানের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার।
পৃথিবীর সব বাবার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। আর সব সন্তানের জন্য রইল ভালোবাসা,আশীর্বাদ এবং একটি সুন্দর আগামী দিনের প্রত্যাশা।

