গাজায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরও শিশুদের প্রাণহানি থামেনি বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)। সংস্থাটির দাবি, গত আট মাসেরও বেশি সময়ে গড়ে প্রতিদিন অন্তত একজন ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে, যা যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
শুক্রবার (১৯ জুন) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইউনিসেফ জানায়, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৬৫ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। জেনেভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার বলেন, যে সময়টিকে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল, সেই সময়েও শিশুদের মৃত্যু অব্যাহত রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও গাজার বহু পরিবারকে নিজেদের সন্তানদের দাফন করতে হয়েছে। তিনি বলেন, শিশুদের জন্য ঘরবাড়ি, স্কুল কিংবা খেলার মাঠ—কোনো স্থানই এখন নিরাপদ নয়। খেলাধুলা বা দৈনন্দিন কাজের সময়ও তারা হামলার শিকার হচ্ছে।
ইউনিসেফ সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করে জানায়, দুই বছর বয়সী এক শিশু গুলিতে নিহত হয়েছে। এছাড়া নিজ তাঁবুর ভেতরে থাকা অবস্থায় ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। পৃথক এক বিমান হামলায় প্রাণ হারিয়েছে পাঁচ বছর বয়সী একটি শিশু ও তার বাবা।
সংস্থাটির তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে চার শতাধিক শিশু গুরুতর আহত হয়েছে। অনেকের আঘাত এতটাই ভয়াবহ যে তারা স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতার ঝুঁকিতে রয়েছে।
জেমস এল্ডার আরও বলেন, গাজার বিভিন্ন এলাকায় আরোপিত সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বাসস্থান বা আশ্রয়কেন্দ্রেও মানুষ নিরাপদ বোধ করছে না।
তিনি সতর্ক করে জানান, শত শত শিশুর জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে তাদের অবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠছে। অনেক আহত শিশুর ক্ষেত্রে সংক্রমণ ও অঙ্গ হারানোর ঝুঁকিও বাড়ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, দীর্ঘদিনের অবরোধ ও সামরিক অভিযানের ফলে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। হাসপাতালগুলো ওষুধ, জ্বালানি, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবলের তীব্র সংকটে রয়েছে।
শিশুদের মানসিক অবস্থার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউনিসেফ। সংস্থাটি বলছে, ভয়, সহিংসতা ও প্রিয়জন হারানোর অভিজ্ঞতা গাজার শিশুদের জীবনের নিয়মিত অংশ হয়ে গেছে, যা তাদের শৈশব ও ভবিষ্যতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ। সংস্থাটির মতে, শিশুদের প্রাণহানি অব্যাহত থাকলে কোনো যুদ্ধবিরতিকেই বাস্তব অর্থে সফল বলা যায় না।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু রয়েছে।

