মো. এ কে নোমান, নওগাঁ প্রতিনিধি:
নওগাঁ সদর উপজেলার বারোমাসি বিল থেকে উদ্ধার হওয়া মোবাইল ও ইলেকট্রনিকস ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করেছে জেলা পুলিশ।
ঘটনার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিহতের ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে একজন আদালতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১১ জুন সকালে নওগাঁ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খবর পান যে সদর উপজেলার বারোমাসি বিলে কচুরিপানার নিচে একটি মরদেহ ভাসছে। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে জেলা পুলিশ সুপারকে অবহিত করা হলে তাঁর নির্দেশনায় পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার, সুরতহাল এবং প্রাথমিক তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে।
পরবর্তীতে মরদেহটি আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুর এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলে শনাক্ত করা হয়। তিনি পুরাতন মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিকস সামগ্রীর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন।
তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, শফিকুল ইসলাম নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় গত ৯ জুন নওগাঁ সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। ব্যবসায়িক কাজে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর ওই দিন বিকেল থেকে তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। জিডির পর থেকেই পুলিশ অনুসন্ধান শুরু করে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা দায়ের হওয়ার পর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের সার্বিক তত্ত্বাবধানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম), সদর থানার ওসি এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে পুলিশ নওগাঁ শহর থেকে জয়নুল এবং মান্দা উপজেলা থেকে আশরাফুলকে গ্রেপ্তার করে। জয়নুলের কাছ থেকে নিহত শফিকুল ইসলামের ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তে জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত জয়নুল, আশরাফুল এবং আরও এক পলাতক সহযোগী মিলে গত ৭ জুন শফিকুল ইসলামকে হত্যার পরিকল্পনা করে। তারা সবাই শফিকুলের ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ৮ জুন ভীমপুর কলেজ মোড় এলাকায় চারজন একত্রিত হন। পরে দুটি মোটরসাইকেলে করে তারা বারোমাসি বিলের পাথরঘাটি ব্রিজ এলাকায় যান। সেখানে পূর্বপরিকল্পিতভাবে পলাতক আসামি শফিকুল ইসলামের গলায় নাইলনের রশি পেঁচিয়ে টান দেয়। এ সময় জয়নুল তাঁর দুই হাত এবং আশরাফুল দুই পা চেপে ধরে রাখে। একপর্যায়ে শফিকুল নিস্তেজ হয়ে পড়লে মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাঁকে বিলের পানিতে বারবার ডুবিয়ে রাখা হয়।
পরে আসামিরা মরদেহটি কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে রেখে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। যাওয়ার সময় তারা শফিকুল ইসলামের মোটরসাইকেল ও নগদ ১ হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে নিজেদের মধ্যে তা ভাগাভাগি করে নেয়।
পুলিশ জানিয়েছে, সামান্য অর্থ ও একটি মোটরসাইকেলের লোভে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অংশীদারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, “ঘটনার পরপরই পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই হত্যার রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। পলাতক অপর আসামিকে গ্রেপ্তারের অভিযানও অব্যাহত রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “নওগাঁ জেলা পুলিশ যেকোনো অপরাধের দ্রুত রহস্য উদঘাটন, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।”

