ভারতে যখন প্রতিনিয়ত ধর্মীয় মেরুকরণ আর বিদ্বেষের খবর শিরোনাম হয়, ঠিক তখনই দিল্লির বুকে এক অনন্য মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন এক মুসলিম পিতা ও তাঁর তরুণ পুত্র। নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড থেকে তাঁরা বাঁচিয়ে নিলেন আটটি তাজা প্রাণ।
সম্প্রতি দিল্লির মালব্য নগর এলাকায় একটি বহুতল ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়লে ভেতরে থাকা বাসিন্দারা বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। চারিদিকে তখন ধোঁয়া আর কান্নার রোল। ওপরের তলাগুলো থেকে বের হওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জীবন বাঁচাতে বাসিন্দারা জানালা দিয়ে নিচে ঝাঁপ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তেই দেবদূতের মতো এগিয়ে আসেন স্থানীয় ম্যাট্রেস বা তোশকের দোকানদার রিয়াজউদ্দিন মানসুরি এবং তাঁর ছেলে আরমান মানসুরি। চোখের সামনে মানুষকে আগুনে পুড়ে মরতে দেখে এক মুহূর্তও দ্বিধা করেননি তাঁরা। নিজেদের ব্যবসার লাভ-ক্ষতির হিসাব ভুলে দোকান থেকে একের পর এক নতুন তোশক বের করে জ্বলন্ত ভবনের নিচে বিছিয়ে দিতে শুরু করেন। প্রায় ২ লাখ রুপি মূল্যের সমস্ত স্টক মুহূর্তের মধ্যে রাস্তায় বিছিয়ে দেওয়া হয়, যাতে ওপর থেকে ঝাঁপ দেওয়া মানুষগুলো মাটিতে পড়ে আঘাত না পায়।
বাপ-বেটার বিছিয়ে দেওয়া সেই তোশকের ওপর ওপরের তলা থেকে একে একে ঝাঁপিয়ে পড়েন আটজন আটকে পড়া মানুষ। শক্ত কংক্রিটের মাটিতে না পড়ে নরম তোশকে পড়ায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান তাঁরা। তবে এই উদ্ধারকাজে অংশ নিতে গিয়ে এবং ওপর থেকে পড়া মানুষের ওজন ও আগুনের তাপে রিয়াজউদ্দিন ও আরমান—উভয়েই আহত হয়েছেন।
বর্তমান ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেখানে প্রায়শই মুসলিম পরিচয়কে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, সেখানে রিয়াজউদ্দিন ও আরমানের এই আত্মত্যাগ এক বিরাট বার্তা দিয়ে গেল। গনগনে আগুনের সেই নরকে কোনো ধর্মীয় দেয়াল ছিল না; সেখানে একদিকে ছিল কিছু বিপন্ন মানুষ, আর অন্যদিকে ছিল দুই সহৃদয় মানবতাবাদী। নেটদুনিয়ায় এখন এই পিতা-পুত্রের প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই। অনেকেই বলছেন, ঘৃণার রাজনীতি হয়তো সাময়িকভাবে মানুষকে বিভক্ত করতে পারে, কিন্তু রিয়াজউদ্দিন মানসুরিরা প্রমাণ করে দিলেন—দিনশেষে মানবতাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি।

