একটি সভ্য সমাজের অস্তিত্বের প্রধান শর্ত হলো তার দুর্বলতম ও অনগ্রসর নাগরিকদের স্বাভাবিক বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় যে চিত্রটি বারবার ফুটে উঠছে, তা গভীর উদ্বেগের এবং একই সাথে চরম গ্লানির। ৩ বছরের অবুঝ শিশু থেকে শুরু করে ৭১ বছরের অশীতিপর বৃদ্ধা পর্যন্ত যেভাবে নৃশংস পৈশাচিকতার শিকার হচ্ছেন, তা প্রমাণ করে যে প্রচলিত অপরাধের ব্যাকরণ দিয়ে এই সংকটকে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। এটি মূলত একটি দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ব্যাধি এবং মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতির চরম বহিঃপ্রকাশ।
আমেরিকার নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক ডক্টর মহসিন আলী যথার্থই উল্লেখ করেছেন, “একটি জাতির শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তার মেগা প্রজেক্ট, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা দৃশ্যমান অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং ইতিহাস বিচার করবে সেই রাষ্ট্র তার সবচেয়ে অরক্ষিত ও দুর্বল নাগরিকদের কতটা নিরাপত্তা দিতে পেরেছে।” ডক্টর আলীর এই বক্তব্য বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী জাতীয় আত্মসমীক্ষা দাবি করে।
পরিসংখ্যানের আয়নায় বর্তমান চিত্র: এক বছরে ধর্ষণের খতিয়ান
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো এখন আর কেবল একক কোনো অপরাধের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি এক গভীর সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক ডাটাবেজ ও প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে গত এক বছরের এক ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে:
মামলার আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি: পুলিশ সদর দপ্তর ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তথ্য অনুসারে, গত এক বছরে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার সংখ্যা প্রায় **২৫%** বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে ধর্ষণের ঘটনা ও মামলা বেড়েছে **২৭%**-এরও বেশি।
৬ মাসের খতিয়ান: মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রাপ্ত উপাত্ত অনুযায়ী, বছরের মাত্র প্রথম ছয় মাসেই সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে প্রায় ১২ হাজার, যার মধ্যে প্রায় ২,৭৪৪টি ছিল সরাসরি ধর্ষণের ঘটনা। অর্থাৎ, গড়ে প্রতিদিন ১১ থেকে ১২ জন নারী ও শিশু এই পাশবিকতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
শিশু ও বৃদ্ধাদের চরম ঝুঁকি: সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, মোট সহিংসতার একটি বড় অংশ জুড়েই রয়েছে অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাশিশু। একই সাথে ঘাটাইলের সাম্প্রতিক ঘটনার মতো সমাজকে স্তব্ধ করে দেওয়া ৭১ বছরের বৃদ্ধাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে অপরাধীদের বিকৃত মানসিকতা এখন আর কোনো নির্দিষ্ট বয়স বা শারীরিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: কেন এই পৈশাচিকতা?
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, এই ধরণের যৌন সহিংসতা মূলত একটি সামাজিক ব্যবস্থার সামগ্রিক ভাঙনের ইঙ্গিত দেয়। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর প্রধান কারণগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
┌──► বিচারহীনতার সংস্কৃতি (আইনি দীর্ঘসূত্রতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার)
│
যৌন সহিংসতার সমাজতাত্ত্বিক নেপথ্য ┼──► ভোগবাদী অপসংস্কৃতি (পাশ্চাত্যের ‘পেপার কাপ ফিলোসফি’ ও যৌথ পরিবারের ভাঙন)
│
└──► মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি (মাদকাসক্তি ও ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা)
১. বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনি দীর্ঘসূত্রতা
অপরাধবিজ্ঞানের অন্যতম মূল তত্ত্ব হলো—অপরাধের শাস্তি যদি দ্রুত ও নিশ্চিত না হয়, তবে অপরাধ করার প্রবণতা জ্যামিতিক হারে বাড়ে। যদিও সম্প্রতি মেহেরপুরের মতো কিছু ঘটনায় মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণার নজির তৈরি হয়েছে, তবুও দেশের সিংহভাগ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এই দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি অন্য অপরাধীদের মনে আইনের প্রতি ভয় সম্পূর্ণ দূর করে দেয়।
২. ভোগবাদী অপসংস্কৃতি ও সামাজিক নজরদারির অভাব
আমাদের ঐতিহ্যগত বাঙালি গ্রামীণ ও নগর সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল একটি শক্তিশালী সামাজিক বন্ধন এবং যৌথ পরিবারের কাঠামোর ওপর। কিন্তু বর্তমানের অতি-পুঁজিবাদী জীবনধারা এবং পাশ্চাত্যের ‘পেপার কাপ সোসাইটি ফিলোসফি’ (ভোগ করো এবং ফেলে দাও)—এর অন্ধ অনুকরণ আমাদের সেই পবিত্র মানবিক সম্পর্কগুলোকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। পাড়া-প্রতিবেশীর মধ্যে যে পারস্পরিক স্নেহ, সম্মান এবং ‘সামাজিক নজরদারি’ (Social Policing) ছিল, তা আজ প্রায় অনুপস্থিত। ফলে সমাজ পরিণত হচ্ছে এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে, যেখানে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
৩. রাজনৈতিক চশমায় অপরাধের মূল্যায়ন
অনেক সময় এ ধরনের বর্বর ঘটনাকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কোনো অপরাধকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করলে বা প্রকৃত ঘটনাকে ধামাচাপা দিলে মূল অপরাধের গুরুত্ব সমাজ থেকে হারিয়ে যায়। সবকিছুকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করার এই প্রবণতা প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে এবং ফলস্বরূপ একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকে।
ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা বন্ধের কার্যকর প্রতিকার
এই ভয়াবহ জাতীয় সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে রাষ্ট্র এবং সমাজকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। কেবল সাময়িক ক্ষোভ প্রকাশ বা ফেসবুকের প্রতিবাদে এই ব্যাধি দূর হবে না।
ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্টের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের মতো মামলাগুলোর জন্য বিশেষায়িত দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল সার্বক্ষণিকভাবে কার্যকর করতে হবে। ঘটনার তদন্ত থেকে শুরু করে রায় কার্যকর করার পুরো প্রক্রিয়াটি যেন একটি নির্দিষ্ট এবং অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে শেষ হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
মাদকের নেটওয়ার্ক ও অনলাইন অবক্ষয় রোধ: এই ধরনের প্রায় প্রতিটি পাশবিক অপরাধের পেছনে কোনো না কোনোভাবে মাদকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। মাদক এবং ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা মানুষের স্বাভাবিক মস্তিস্কের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। তাই মাদকের চোরাচালান কঠোর হস্তে দমনের পাশাপাশি সাইবার স্পেসে পর্নোগ্রাফির বিস্তার বন্ধ করতে হবে।
সামাজিক প্রতিরোধ ও বয়কট: প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় নারী ও শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন করতে হবে। অপরাধীকে এবং তার পরিবারকে সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ বয়কট করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয় না পায়।
শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসনের ভূমিকা: মূল উপাটনের হাতিয়ার
যৌন সহিংসতার এই মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি দূর করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রকৃত ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা। প্রথাবদ্ধ জিপিএ-কেন্দ্রিক শিক্ষা দিয়ে হয়তো ভালো কেরানি বা করপোরেট কর্মকর্তা বানানো সম্ভব, কিন্তু একজন সংবেদনশীল ও মানবিক মানুষ তৈরি করা সম্ভব নয়।
┌──► নৈতিকতার সংযোজন (ব্যক্তিগত সীমানা ও নারীর প্রতি সম্মান)
│
শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসনের মেলবন্ধন ┼──► সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা (দেশীয় ঐতিহ্য, খেলাধুলা ও পাঠাগার)
│
└──► ধর্মীয় অনুশাসন (আত্মশুদ্ধি, পরমতসহিষ্ণুতা ও জবাবদিহিতা)
১. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানবিক ও নৈতিক শিক্ষার প্রবর্তন
শুধু প্রযুক্তির উন্নয়ন বা অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করলেই চলবে না। প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষা ব্যবস্থায় সমাজ ব্যবস্থা, দেশীয় সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধের সুসমন্বয় ঘটাতে হবে। পাঠ্যসূচিতে এমন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যা শিশুদের শৈশব থেকেই নিজের এবং অন্যের ‘শারীরিক সীমানা’ (Body Autonomy) বুঝতে শেখাবে এবং নারীর প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে শিক্ষার্থীদের কোনো মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতি ঘটলে তা শুরুতেই নিরাময় করা যায়।
২. ধর্মীয় অনুশাসন ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের জাগরণ
ধর্ম মানুষকে আত্মশুদ্ধি, পরমতসহিষ্ণুতা এবং প্রতিটি কাজের জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে জবাবদিহিতার শিক্ষা দেয়। সমাজ থেকে ধর্ম এবং ন্যায়চর্চার বর্জনই এই নৈতিক স্খলনের অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবার, মসজিদ, মন্দির, চার্চসহ সকল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে যুবসমাজের প্রতি নিয়মিত নৈতিক আচরণ, পরোপকার এবং নারীর সম্ভ্রম রক্ষার তাগিদ দিতে হবে। ধর্মীয় অনুশাসন কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, তা যেন মানুষের ভেতরের পশুত্বকে দমন করতে পারে—সেই প্রকৃত আধ্যাত্মিক শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে।
৩. সুস্থ সাংস্কৃতিক জাগরণ
অপসংস্কৃতির আগ্রাসন রুখতে হলে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পাড়া-মহল্লায় সুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, খেলাধুলা ও পাঠাগার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সুস্থ নাটক, সিনেমা ও সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে তরুণদের মানসিকতাকে পরিশীলিত করতে হবে।
ডক্টর মহসিন আলী তাঁর নিবন্ধের শেষে একটি চরম সত্য উচ্চারণ করেছেন, “ইতিহাস আমাদের অবহেলা ও নীরবতার জন্য ক্ষমা করবে না। শিশুদের কান্না যখন একটি জাতির রুটিন শব্দে পরিণত হয়, তখন বুঝতে হবে সেই সভ্যতার পতন আসন্ন।”
৩ বছরের শিশু কিংবা ৭১ বছরের বৃদ্ধার ওপর যে বর্বরতা আজ আমরা দেখছি, তা মূলত আমাদের ভেঙে পড়া সমাজ ব্যবস্থারই তীব্র আর্তনাদ। এই অন্ধকারের গ্রাস থেকে আমাদের নিজেদের পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে এখনই জাগতে হবে। প্রথাবদ্ধ শিক্ষার সাথে নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় অনুশাসনের এক অপূর্ব সুসমন্বয় ঘটিয়ে একটি অপসংস্কৃতিমুক্ত, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের প্রধান জাতীয় অঙ্গীকার।
লেখক ডক্টর দিপু সিদ্দিকী,কবি ও প্রাবন্ধিক এবং ডিন কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ রয়েল ইউনিভার্সিটি অভ ঢাকা।

