শাহজাহান আলী মনন, সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি:
নীলফামারীর সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতাল ময়লা আবর্জনা আর দূষণে নিজেই অসুস্থ রোগীতে পরিণত হয়েছে। নিয়মিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা আর তদারকির অভাবে সৈয়দপুরসহ আশপাাশের এলাকার প্রায় ১০ লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবার একমাত্র সরকারী প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা খুবই করুণ।
যত্রতত্র মেডিকেল বর্জ্যসহ বিভিন্ন ময়লা আবর্জনা পড়ে থাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পরিবেশের চরম দূষণ হচ্ছে। এতে রোগীরাসহ চিকিৎসায় নিয়োজিত কর্মকর্তা কর্মচারীরাও দূভোর্গে রয়েছেন। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অভাবে এই বেহাল দশা বলে দাবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। এজন্য তারা সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
সরেজমিনে সোমবার (২৫ মে) বেলা ১২ টায় হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতাল চত্বরসহ আশপাশে দীর্ঘদিনের ময়লা আবর্জনা পড়ে আছে। বিশেষ করে ভবনগুলোর কার্নিসে এবং নিচে পুড়ো ক্যাম্পাসজুড়েই বিরাজ করছে পঁচা দূর্গন্ধময় বর্জ্য। এগুলোতে বৃষ্টির পানি জমে পুরো পরিবেশকে চরমভাবে দুষিত করে তুলেছে। তার উপর মাছি বসে রোগ জীবাণু ছড়াচ্ছে। পাশাপাশি ওয়ার্ডগুলোতে পানের পিকসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য ও ফলমুলের খোসা পড়ে আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর হচ্ছে মেডিকেল বর্জ্য। ইনজেকশনের বোতল, নিডল, ন্যাপকিন, প্রস্রাব-পায়খানাসহ ডায়াপার, ব্যবহৃত তুলা, গজ, ব্যান্ডেজ ব্যাপকভাবে বিদ্যমান আবর্জনার স্তুপগুলোতে। সেই সাথে হাসপাতালের একমাত্র ডাস্টবিনটিতে আবর্জনা উপচে পড়ে চারপাশে ছড়িয়ে ছিটে ভয়াবহ পরিস্তিতির সৃষ্টি করেছে।
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের একটি ক্যাবিনে ভর্তি রোগীর পিতা সৈয়দপুরের মকবুল হোসেন বিএম কলেজের প্রভাষক ফরিদুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালের পরিবেশ খুবই নাজুক ও অস্বাস্থ্যকর। মেঝে আর দেওয়ালে পানের পিক, ধুলা-বালি, ময়লা-আবর্জনা। টয়লেটগুলোও অপরিস্কার। কার্নিসগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলছে বিভিন্ন মেডিকেল বর্জ্য। যা পঁচে চরম দূর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মাছি উড়ছে আর পুরো হাসপাতালে রোগ ছড়াচ্ছে। হাসপাতালে প্রবেশের পথে দুই পাশে পানি জমে মশা উৎপাদনের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ফলে দিন রাত মশার উপদ্রব। সব মিলিয়ে রোগী সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে আরও রোগাক্রান্ত হয়ে বাড়ি ফিরছে।
একইভাবে অভিযোগ করেন সৈয়দপুর উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নের বটেরঘাট থেকে আসা শিশু রোগীর মা আয়শা। তিনি বলেন, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে গত রাতে হাসপাতালে এসেছি। কিন্তু সিট পাওয়া যায়নি তাই রুমের বাইরে ফ্লোরেই বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এখানে চরম দূর্গন্ধ আর ধুলা-বালিতে ভরপুর। পাশ দিয়ে লোকজন যাতায়াত করায় পরিস্থিতি খুবই খারাপ। তার উপর রাতে একবার আর দিনে বেলা ১১ টায় একবার মাত্র ডাক্তার দেখে গেছে। বিদ্যুতের অভাবে নেবুলাইজার আর অক্সিজেন দিতেও ব্যাঘাত ঘটছে। অস্বাস্থকর পরিবেশের কারণেই এখানে রোগীরা আরও বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।
দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার ঘুঘরাতলি থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আরজিনা বেগম বলেন, হাসপাতাল ১০০ বেডের হলেও সে অনুযায়ী সুবিধা নাই। সব ওয়ার্ডেই সিট না পেয়ে রোগীরা মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। এক্ষেত্রে যে বিছানা দেওয়া হয়েছে সেগুলো খুবই নোংরা। শুধু তোষক দেওয়া হয়েছে। চাদর নাই, বালিশও নাই। মশার উপদ্রব। চারপাশের পঁচা ময়লা আবর্জনার দুর্গন্ধ। চরম অস্বস্তিকর ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। নিঃশ্বাস নেওয়াও কষ্টকর। গা গুলিয়ে যাওয়ার অবস্থা।
এব্যাপারে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. নাজমুল হুদা বলেন, আমরা চেষ্টা করছি হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে। আমাদের এখানে ময়লা শোধণাগার না থাকায় এবং ডাস্টবিন থেকে আবর্জনা পৌরসভার লোকজন নিয়মিত না নিয়ে যাওয়ায় কিছুটা বিড়ম্বনাকর পরিস্থিতিতে আছি। তাছাড়া আমাদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরও সংকট। তাদের দিয়ে হাসপাতালের ভিতরের পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছি এবং অনেকটা সফলও হয়েছি। কিন্তু বাইরের ময়লা অসপারণের জন্য পৌরসভার সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতাল পরিপূর্ণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হলে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এজন্য ঠিকাদারের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ দিলে ভালো হয়। তাহলে ঠিকাদারকে চাপে রেখে কাজ সঠিকভাবে আদায় করা সম্ভব হবে। নয়তো যে সুইপার সরকারীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত তাদের দিয়ে যথাযথভাবে কাজ করানো খুবই কঠিন। তাই এব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমি একটি প্রস্তাবনা পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছি। সেজন্য স্থানীয় এমপিসহ রাজনৈতিক ও সচেতন সুধিজনের সম্মিলিত সহযোগিতা আশা করি।

