জয়পুরহাট প্রতিনিধি:
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন মিনি স্টেডিয়ামের কাজ ঘিরে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সিঁড়িঘরের মেঝের নিচে বালুর পরিবর্তে মাটি দিয়ে ভরাট, মরিচাধরা রড ব্যবহার এবং কাদামাটিযুক্ত অবস্থায় কংক্রিট ঢালাই প্রস্তুতির মতো নানা অনিয়মের চিত্র সরেজমিনে দেখা গেছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে নির্মাণকাজের স্থায়িত্ব ও গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত ৫ মে বাউন্ডারি বিম নির্মাণে রিংকলাম বসানোর কথা থাকলেও ঠিকাদার রিংকলাম বাদ দিয়েই ঢালাই কাজ সম্পন্ন করেন। পরে বিষয়টি স্থানীয় লোকজনের নজরে এলে তারা প্রতিবাদ জানান। একপর্যায়ে নির্মিত অংশ ভেঙে ফেলে পুনরায় রিংকলাম দিয়ে নতুন করে বিম নির্মাণ করা হয়।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপজেলা পর্যায়ে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ প্রকল্প-২য় পর্যায় (১ম সংশোধিত)” প্রকল্পের আওতায় কালাই উপজেলায় এ স্টেডিয়াম নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ১২ মাস মেয়াদি এ প্রকল্পের চুক্তিমূল্য ৭ কোটি ৪৯ লাখ ৮২ হাজার ৯৯৯ টাকা। কাজটি বাস্তবায়ন করছে পাবনার সুজানগরের ঠিকাদার মো. রফিকুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন স্টেডিয়ামের সিঁড়িঘরের মেঝের গ্রেড বিম অংশের ওপর প্রায় দুই ফুট ভরাটের কথা থাকলেও সেখানে মাত্র ছয় ইঞ্চি বালু ব্যবহার করা হয়েছে। বাকি অংশ মাটি দিয়ে ভরাট করে তার ওপর ইটের সলিং বসানো হয়েছে। এছাড়া কয়েকটি স্থানে মরিচাধরা রড ব্যবহার করতে দেখা গেছে। গ্রেড বিমের খাঁচার ভেতরে কাদামাটি জমে থাকা অবস্থায়ই কংক্রিট ঢালাইয়ের প্রস্তুতিও চলছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি অর্থে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এমন নিম্নমানের কাজ ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
পাঁচশিরা বাজারের ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন বলেন, “স্টেডিয়ামের কাজ দেখে আমাদের মনে অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মেঝেতে বালুর বদলে মাটি ভরাট করা হচ্ছে। যদি ইস্টিমেট অনুযায়ী কাজ না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এটি কতদিন টিকবে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার মো. সোহেল বলেন, “ড্রয়িং ও প্রকৌশলীদের নির্দেশনা অনুযায়ীই কাজ করা হচ্ছে। কোনো ধরনের অনিয়ম করা হচ্ছে না।
নির্মাণকাজে নিয়োজিত হেড মিস্ত্রি আবুল হোসেন বলেন, “আমরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করি। ব্যক্তিগতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।
এদিকে প্রকল্পের কনসালটেন্ট ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল লতিফ দাবি করেন, অনিয়মের বিষয়গুলো নজরে আসার পর প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “গ্রেড বিমের ওপর পুরো দুই ফুট অংশ বালু দিয়ে ভরাট করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেসব স্থানে মাটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা অপসারণ করতে বলা হয়েছে। এছাড়া কংক্রিট ঢালাইয়ের আগে খাঁচার ভেতরের কাদামাটি পরিষ্কার করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
মরিচাধরা রড ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, বৃষ্টির কারণে কিছু রডে মরিচা ধরেছে। শতভাগ রোধ করা কঠিন। তবে ব্যবহারের আগে পরিষ্কার করা হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। তদারকির দুর্বলতা এবং জবাবদিহিতার অভাবের কারণে অনেক সময় সরকারি প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। কালাইয়ের এই স্টেডিয়াম নিয়েও এখন একই ধরনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় ক্রীড়ামোদীরা জানান, দীর্ঘদিনের দাবির পর কালাইয়ে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ শুরু হয়েছে। তাই তারা চান, প্রকল্পটি যেন সঠিক মান বজায় রেখে বাস্তবায়ন করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণ শুধু ভবন তৈরির বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। তাই নির্মাণকাজে কোনো ধরনের গাফিলতি বা অনিয়ম হলে তা সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি জনস্বার্থেরও ক্ষতি করবে।
এ বিষয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

