সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে কর্পোরেট চাকরিতে যুক্ত ছিলেন তিনি। শহুরে আরাম-আয়েশের জীবনও ছিল সামনে। কিন্তু মনের ভেতর লালিত স্বপ্ন ছিল ভিন্ন কিছু করার। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতেই চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসেন দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার নশরতপুর ইউনিয়নের ফকিরপাড়ার তরুণ উদ্যোক্তা সৈয়দ আল আমিন।
আর এখন তিনি গড়ে তুলেছেন সম্পূর্ণ দেশীয় ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগলের একটি বাণিজ্যিক খামার, যা ইতোমধ্যেই এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
“তারাবান ব্ল্যাক বেঙ্গল খামার” নামে পরিচিত এই খামারে বর্তমানে রয়েছে ৯০টিরও বেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগল। মাত্র দেড় বছর আগে ১৪টি ছাগল ও একটি পাঁঠা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন আল আমিন। আজ সেই ছোট উদ্যোগই বড় স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলেছে।
খামার ঘুরে দেখা যায়, সম্পূর্ণ দেশীয় পরিবেশে প্রাকৃতিক উপায়ে ছাগল পালন করা হচ্ছে। সকাল হলেই ছাগলগুলোকে মাঠে চরতে নিয়ে যাওয়া হয়। সারাদিন দেশীয় ঘাস খেয়ে বেড়ে ওঠে এসব ছাগল। বিকেলে আবার ফিরিয়ে আনা হয় বিশেষভাবে তৈরি ঘরে। মাটি থেকে প্রায় এক ফুট উঁচুতে বাঁশের মাচার ওপর ছাগল রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে মলমূত্র শরীরে না লাগে এবং রোগবালাই কম হয়। সকালে ছাগল মাঠে চলে গেলে পরিষ্কার করা হয় পুরো ঘর।
খামারের কর্মচারী মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, এই খামারে কাজ করে আমি কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছি। প্রতিদিন ছাগল চরানো, খাবার দেওয়া, ঘর পরিষ্কারসহ নানা কাজ করি। আল আমিন ভাই নিজেও প্রতিটি ছাগলের খুব যত্ন নেন। প্রতিটি ছাগলের সঙ্গে যেন তার আলাদা সখ্যতা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, একসময় অনেকেই উচ্চশিক্ষিত একজন যুবকের ছাগলের খামার করা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করতেন। কিন্তু এখন সেই মানুষগুলোর অনেকেই তার প্রশংসা করছেন। অনেক তরুণ তার খামার দেখে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন এবং নিজ বাড়িতে ছোট পরিসরে ছাগল পালন শুরু করেছেন।
সৈয়দ আল আমিন বলেন, “ভালো চাকরি করলেও মনে সবসময় একটা স্বপ্ন কাজ করত—নিজ দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাণিসম্পদ নিয়ে কাজ করব। পরিবার, বিশেষ করে আমার স্ত্রী আমাকে সাহস দিয়েছে। চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেছি। সিরাজগঞ্জ, রংপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁওসহ বিভিন্ন জায়গার খামারিদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের অভিজ্ঞতা নিয়েই শুরু করি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের খামার।
তিনি বলেন, “এই ছাগল সম্পূর্ণ দেশীয়। খুব অল্প জায়গায় পালন করা যায়। বছরে দুইবার বাচ্চা দেয় এবং একেকবারে তিন-চারটি পর্যন্ত বাচ্চা হয়। তাই বাণিজ্যিকভাবে এটি খুব লাভজনক। বর্তমানে আমার খামারে ৯০টির বেশি ছাগল রয়েছে। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে ২৫টি খাসি বিক্রি করেছি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে আল আমিন বলেন, “আমি চাই একসময় আমাদের দেশীয় ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত হোক। সুযোগ পেলে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে চাই এই ছাগল নিয়েই। ভবিষ্যতে ছাগলের মাংস ও দুধ বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করারও পরিকল্পনা রয়েছে।
আল আমিনের বড় ভাই সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, “ছোট ভাই যখন বলল চাকরি ছেড়ে ছাগলের খামার করবে, তখন অনেকেই অবাক হয়েছিল। কিন্তু আমরা পরিবার থেকে তাকে সমর্থন দিয়েছি। এখন তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। গ্রামের মানুষও এখন তাকে উৎসাহ দিচ্ছে।
খামারটি পরিদর্শনে এসে স্থানীয় উদ্যোক্তা হযরত আলী বলেন, “আমি নিজেও গরুর খামার করি। কিন্তু আল আমিন যেভাবে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল নিয়ে কাজ করছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। ছাগল রাখার পদ্ধতি খুব সুন্দর। একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে খুব দ্রুত সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
দিনাজপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুর রহিম বলেন, “ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল আমাদের দেশের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত। এটি সম্পূর্ণ দেশীয় জাত এবং আমাদের আবহাওয়ার সঙ্গে অত্যন্ত মানানসই। বছরে দুইবার বাচ্চা দেয়, মাংস অত্যন্ত সুস্বাদু এবং বাজারে এর চাহিদাও অনেক বেশি।
তিনি আরও বলেন, “উচ্চশিক্ষিত তরুণ সৈয়দ আল আমিন এই খামার গড়ে তুলে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে তাকে টিকাসহ বিভিন্ন কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এভাবে আরও তরুণ যদি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালনে এগিয়ে আসে, তাহলে হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় জাত আবারও সমৃদ্ধ হবে এবং বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

