সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নতুন বেতনকাঠামো আগামী ১ জুলাই (২০২৬-২৭ নতুন অর্থবছরের শুরু) থেকেই বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশই নীতিগতভাবে আমলে নিচ্ছে বর্তমান সরকার।
কমিটির মূল সুপারিশ অনুযায়ী, একবারে নয় বরং তিন অর্থবছরে মোট তিন ধাপে এই নতুন বেতনকাঠামো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সুপারিশে ইতিমধ্যেই তাঁর নীতিগত সম্মতি প্রদান করেছেন।তিন ধাপে বাস্তবায়নের রূপরেখা ও বাজেট বরাদ্দঅর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী ১ জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই নতুন বেতনকাঠামো বাবদ অতিরিক্ত প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তুতি চলছে।
তিন ধাপের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটি হবে নিম্নরূপ:প্রথম অর্থবছর (১ জুলাই ২০২৬ থেকে): নতুন স্কেলের মূল বেতনের (Basic Salary) ৫০ শতাংশ দেওয়া হবে।দ্বিতীয় অর্থবছর (১ জুলাই ২০২৭ থেকে): মূল বেতনের বাকি ৫০ শতাংশ যোগ হয়ে শতভাগ মূল বেতন কার্যকর হবে।তৃতীয় অর্থবছর (১ জুলাই ২০২৮ থেকে): নতুন স্কেল অনুযায়ী অন্যান্য সব ধরণের ভাতা (যেমন: বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ইত্যাদি) প্রদান শুরু হবে।পটভূমি: সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের একটি বেতন কমিশন গঠন করা হয়েছিল।
কমিশন গত ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। পরবর্তীতে ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর, গত ২৩ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের এই পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়, যারা এই ৩ ধাপে বাস্তবায়নের সূত্রটি সুপারিশ করে।সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের তুলনামূলক চিত্রপ্রস্তাবিত নতুন বেতনকাঠামোয় গ্রেড বা ধাপ আগের মতোই ২০টি বহাল রাখা হলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
বিবরণবর্তমান কাঠামো (২০১৫)প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো (২০২৬)সর্বনিম্ন স্কেল (২০তম গ্রেড)৮,২৫০ টাকা২০,০০০ টাকাসর্বোচ্চ স্কেল (১ম গ্রেড – নির্ধারিত)৭৮,০০০ টাকা১,৬০,০০০ টাকানোট: মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এবং সিনিয়র সচিবদের জন্য এই ২০টি ধাপের বাইরে সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিশেষ ধাপ বা স্কেল তৈরি করবে অর্থ বিভাগ, যা পরবর্তীতে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হবে।ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার পরিবর্তনমূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য ভাতার ক্ষেত্রেও বড় ধরণের পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে কমিশন:বৈশাখী ভাতা: সরকারি চাকরিজীবীরা এত দিন মূল বেতনের ২০ শতাংশ বৈশাখী ভাতা পেতেন। নতুন কাঠামোয় তা আড়াই গুণ বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে।যাতায়াত ভাতা: আগে কেবল ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা যাতায়াত ভাতা পেতেন। নতুন সুপারিশে পরিধি বাড়িয়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত এই ভাতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অন্যান্য ভাতা: মূল বেতন বাড়ার ফলে এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতার অঙ্কও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে।পেনশনভোগীদের জন্য সুখবর (শতভাগের বেশি বৃদ্ধির সুপারিশ)সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা পেনশনভোগীদের পেনশনের হারও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে:২০ হাজার টাকার কম (মাসিক পেনশন): তাদের পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে।২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা (মাসিক পেনশন): তাদের পেনশন বৃদ্ধি পেতে পারে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত।
৪০ হাজার টাকার বেশি (মাসিক পেনশন): তাদের পেনশন বাড়তে পারে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত।চিকিৎসা ভাতা (বয়সভিত্তিক):পেনশনধারীদের উন্নত চিকিৎসার কথা বিবেচনা করে ৭৫ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ পেনশনভোগীদের মাসিক চিকিৎসা ভাতা ১০ হাজার টাকা এবং ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য ৮ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা দেওয়ার বিশেষ সুপারিশ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে পেনশনভোগীদের জন্য প্রথম ধাপে কতটুকু আর্থিক অংশ বরাদ্দ দেওয়া যায়, তা চূড়ান্ত করতে অর্থ বিভাগ এখন কাজ করছে।

