সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর প্রতিনিধি:
দিনাজপুরের বিরলে মরু অঞ্চলের প্রাণী দুম্বা এখন গ্রামবাংলার নতুন আকর্ষণ। সৌখিনতা থেকে শুরু হলেও বর্তমানে তা রূপ নিয়েছে সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক খামারে। উপজেলার শহরগ্রাম ইউনিয়নের গোবিন্দপুর খেরবাড়ি গ্রামে গড়ে ওঠা এই ব্যতিক্রমী দুম্বার খামার দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন নানা এলাকার মানুষ।
দু্ম্বা খামারটির উদ্যোক্তা ফয়েজ তাহের। এলাকায় তিনি “চৌধুরী সাহেব” নামেই বেশি পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে হজ এজেন্সির সঙ্গে যুক্ত থাকায় প্রতিবছর তিনি হাজীদের নিয়ে সৌদি আরবে যান। সেই সূত্রে সৌদি আরবের কয়েকজন বিখ্যাত দুম্বা খামারির সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে তাদের কাছ থেকে উপহার হিসেবে চারটি দুম্বা পান তিনি। আর সেখান থেকেই শুরু হয় দুম্বা পালনের স্বপ্নযাত্রা।
গত দুই বছর আগে মাত্র চারটি দুম্বা দিয়ে শুরু হওয়া সেই খামারে বর্তমানে রয়েছে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টি দুম্বা। আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে ৮ থেকে ১০টি বড় আকারের দুম্বা কুরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিটি দুম্বার দাম ধরা হচ্ছে প্রায় দেড় লাখ থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত।
ফয়েজ তাহের (৬৫) নিজ বাড়িতেই গড়ে তোলা এই খামার এখন পুরো এলাকায় কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। মরু অঞ্চলের প্রাণী দুম্বা কাছ থেকে দেখতে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ভিড় করছেন। শুধু দর্শনার্থীই নয়, অনেক নতুন উদ্যোক্তাও খামারটি দেখে দুম্বা পালনে আগ্রহী হচ্ছেন।
খামারটিতে বর্তমানে তিন থেকে পাঁচজনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। কর্মীরা নিয়মিত দুম্বাগুলোর খাবার পরিবেশন, গোসল করানো, ঘর পরিষ্কার এবং সার্বিক পরিচর্যার কাজ করছেন। কর্মচারীদের আন্তরিক যত্ন ও পরিচর্যায় খামারটি দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে। আগামী বছর দুম্বার সংখ্যা অর্ধশতাধিক ছাড়াবে বলে আশা করছেন ।
খামারের উদ্যোক্তা ফয়েজ তাহেরের ভাতিজা সাদিকুল ইসলাম বলেন, চাচার সৌখিনতা থেকেই মূলত এই খামারের শুরু। প্রথমে চার-পাঁচটি দুম্বা ছিল, এখন ৩০-৩৫টি হয়েছে। বড় দুম্বাগুলোর ওজন প্রায় এক থেকে দেড় মণ পর্যন্ত। নিয়মিত উন্নত খাবার, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং বিশেষ যত্নের কারণে দুম্বাগুলো খুব দ্রুত বড় হচ্ছে।
তিনি জানান, দুম্বাগুলোর থাকার জায়গা মাটি থেকে কিছুটা উঁচু করে তৈরি করা হয়েছে। রাতে বাল্ব জ্বালিয়ে রাখা হয় যাতে তারা উষ্ণ পরিবেশ পায়। এছাড়া দুম্বা বছরে দুইবার বাচ্চা দেয় বলে খামারটি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। চাচা মূলত ঢাকায় বেশি সময় থাকেন। কর্মচারীরা দুম্বার পরিচর্যা করে থাকে। মাঝেমধ্যে আমিও দুম্বার খামারে এসে দুম্বা দেখে যাই এবং পরামর্শ প্রদান করি।
দুম্বা খামারের কর্মী নাজির উদ্দিন বলেন, আমাদের চৌধুরী সাহেব অনেক যত্ন করে এই খামার গড়ে তুলেছেন। আমরা প্রতিদিন দুম্বাগুলোর দেখভাল করি। দিনে তিন থেকে চারবার খাবার দিতে হয়, সপ্তাহে দুইবার গোসল করাতে হয়। এত আদর-যত্নের কারণে দুম্বাগুলো এখন আমাদের কথা শুনে। ডাক দিলেই পিছনে পিছনে চলে আসে।
তিনি আরও বলেন, ছোলা, এংকার বুট, কাঁচা ঘাস, ফিট ও বিভিন্ন ধরনের খাদ্য খেতে দুম্বাগুলো বেশি পছন্দ করে। দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করতেই তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ধীরে ধীরে দেশের আবহাওয়ার সঙ্গেও প্রাণীগুলো মানিয়ে নিয়েছে।
দুম্বা খামারের নারী কর্মী হাজরা বেগম বলেন, প্রায় দেড় বছর ধরে এই খামারে কাজ করছি। প্রথমে দুম্বাগুলোকে সামলাতে একটু কষ্ট হতো। এখন তারা আমাদের সঙ্গে অনেক বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। নিয়মিত খাবার দেওয়া, গোসল করানো আর পরিচর্যার কারণে তারা খুব শান্ত থাকে।
তিনি জানান, দুম্বাগুলো খোলামেলা পরিবেশে থাকতে বেশি পছন্দ করে। চারদিকে ঘেরা একটি নির্দিষ্ট স্থানে তাদের রাখা হয়। ক্ষুধা লাগলে তারা ডাকাডাকি করে কর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোবারক আলী বলেন, আমরা আগে কখনো দুম্বা দেখিনি। চৌধুরী সাহেব প্রথম যখন কয়েকটি দুম্বা আনেন তখন অনেকেই অবাক হয়েছিল। এখন বড় খামার হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ দেখতে আসে। মরুর প্রাণী আমাদের গ্রামে বড় হবে, এটা আগে কল্পনাও করিনি।
একই গ্রামের হায়দার আলী বলেন, কিছুদিন আগে মসজিদে একটি দুম্বা জবাই করে সবাইকে দাওয়াত দিয়েছিলেন চৌধুরী সাহেব। আমরা খিচুড়ির সঙ্গে দুম্বার মাংস খেয়েছি। মাংস অত্যন্ত সুস্বাদু ছিল। জীবনে প্রথমবার দুম্বার মাংস খেলাম, সেই স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে।
দিনাজপুর ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ডা. আশিকা আকবর তৃষা বলেন, গত কয়েক বছরে দেশে বেশ কয়েকটি দুম্বার খামার গড়ে উঠেছে। মরু অঞ্চলের প্রাণী হলেও ধীরে ধীরে বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে। নিয়মিত চিকিৎসা ও সঠিক পরিচর্যার কারণে দুম্বা পালন এখন সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হচ্ছে।
তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা নিয়মিত এসব খামারে পরামর্শ ও চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। ফলে দেশে দুম্বা চাষ ও পালন ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং কুরবানির পশু হিসেবেও এর চাহিদা বাড়ছে।

