জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি আমির সাঈদ ইরাভানি নিরাপত্তা পরিষদের কাছে এক আনুষ্ঠানিক চিঠিতে মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি দেশের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও বিপুল অংকের আর্থিক জরিমানার দাবি জানিয়েছেন।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানি ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চালানো সামরিক হামলায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করার অভিযোগে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানের বিরুদ্ধে এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে তেহরান। ১ মে পাঠানো এই চতুর্থ চিঠিতে ইরাভানি দাবি করেছেন যে, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিমানঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহার করেই ইরান বিরোধী হামলা চালানো হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় ইরান একে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে এবং আক্রান্ত দেশ হিসেবে আত্মরক্ষার অধিকার থেকে এই দেশগুলোর কাছ থেকে বস্তুগত ও নৈতিক ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।
ক্ষতিপূরণ দাবির পাশাপাশি পারস্য উপসাগরের তিনটি বিতর্কিত দ্বীপ—আবু মুসা, গ্রেটার তুনব এবং লেসার তুনব—এর ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের বিষয়টিকেও চিঠিতে পুনরায় সামনে আনা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দাবির বিপরীতে ইরান স্পষ্ট করেছে যে, এই দ্বীপগুলো তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এ বিষয়ে কোনো আন্তর্জাতিক আদালত বা তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবে না।
ইরানের এই দাবির বিপরীতে সংশ্লিষ্ট ছয়টি দেশ এবং জর্ডান একটি যৌথ বিবৃতি দিয়ে ইরানের অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশগুলোর অভিযোগ, ইরান ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়ে তাদের বেসামরিক অবকাঠামো, বন্দর ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান জরিমানা দাবি করলেও উল্টো ইরানকেই তাদের ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়বদ্ধ থাকতে হবে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশগুলো একে ইরানের পূর্বপরিকল্পিত আগ্রাসন বলে মনে করছে।
জাতিসংঘ বর্তমানে ইরানের দাবির বিপরীতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত ১১ মার্চ, ২০২৬ তারিখে পাস হওয়া নিরাপত্তা পরিষদের ২৮১৭ নম্বর প্রস্তাবে উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে এবং ইরানকে অবিলম্বে সব ধরনের সামরিক তৎপরতা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটি ১৩৫টি দেশের সমর্থন পেলেও রাশিয়া ও চীন ভোটদানে বিরত ছিল। এছাড়া জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল এবং মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানালেও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের বাধার তীব্র সমালোচনা করেছেন।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অভিযোগের বিপরীতে জাতিসংঘের এই অবস্থানের পেছনে নিরাপত্তা পরিষদের গঠন ও ভেটো ক্ষমতার রাজনীতি কাজ করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা ইরানের বিপক্ষে থাকায় কোনো প্রস্তাব সহজেই পাস হয়, যা অনেক সময় আন্তর্জাতিক আইনের দ্বিমুখী আচরণ বা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে সমালোচিত হয়।
জাতিসংঘের বাজেটে মার্কিন প্রভাব এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর কূটনৈতিক সমীকরণের কারণে ইরানের অভিযোগগুলো সেখানে কতটা গুরুত্ব পাবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা কেবল একটি আঞ্চলিক বিরোধ নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির মহড়ায় পরিণত হয়েছে।

