সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) দীর্ঘ ৫৯ বছরের সদস্যপদ ছিন্ন করে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর শক্তিশালী জোট ওপেক (OPEC) এবং ওপেক প্লাস (OPEC+) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছে। ১ মে ২০২৬ থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে যেমন অস্থিরতা তৈরি করেছে, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আমিরাত জানিয়েছে, তাদের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক রূপকল্প বাস্তবায়নে উৎপাদন কোটা বা সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নিজস্ব তেল উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক ৩২ লাখ ব্যারেল থেকে বাড়িয়ে ৫০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করার যে লক্ষ্য আমিরাত নিয়েছে, তা ওপেক প্লাসের নীতিমালার মধ্যে থেকে সম্ভব ছিল না। তবে এই প্রস্থান কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং সৌদি আরবের আঞ্চলিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আমিরাতের একটি সরাসরি কূটনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ওপেক থেকে আমিরাতের সরে যাওয়া সৌদি আরবের একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
বর্তমান ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যখন জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন আমিরাতের এই পদত্যাগ বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করেছে। যদিও বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুড ওয়েলের দাম প্রতি ব্যারেল ১১২ ডলারের আশেপাশে স্থিতিশীল রয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে আমিরাতের বর্ধিত উৎপাদনের ফলে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসার সম্ভাবনা দেখছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির গভীর প্রভাব রয়েছে। ইয়েমেন ইস্যু থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক আধিপত্যের লড়াইয়ে সৌদি আরবের সাথে আমিরাতের বর্তমান টানাপোড়েন এখন আর পর্দার আড়ালে নেই। ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এসটিসি-কে আমিরাতের সরাসরি সমর্থন এবং লোহিত সাগরের কৌশলগত বন্দরগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা সৌদি আরবের স্বার্থের বিপরীতে চলে গেছে। অন্যদিকে, আব্রাহাম অ্যাকর্ডের মাধ্যমে ইসরায়েলের সাথে সামরিক ও প্রযুক্তিগত মিত্রতা এবং ভারত-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-আমিরাত নিয়ে গঠিত I2U2 জোট আমিরাতকে এক স্বতন্ত্র শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে।
বিশেষ করে ‘ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর’ (IMEC) প্রকল্পের মাধ্যমে আমিরাত নিজেকে বিশ্ব লজিস্টিকস হাব হিসেবে গড়ে তুলছে, যা সুয়েজ খালের বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এই করিডোর কেবল ভারত বা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, বরং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি ও বিকল্প পরিবহন রুটের মাধ্যমে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্যও নতুন সম্ভাবনা ও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
পরিশেষে, আমিরাতের এই ‘সভ্যরিন পিভট’ বা সার্বভৌম অবস্থান পরিবর্তনের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভারসাম্য এখন আর কেবল রিয়াদ বা ওয়াশিংটন কেন্দ্রিক নেই। ইসরায়েল ও ভারতের সাথে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা এবং ওপেকের প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়া—সব মিলিয়ে আমিরাত এক নতুন মধ্যপ্রাচ্যের রূপরেখা তৈরি করছে, যেখানে তেলের রাজনীতির চেয়ে আধুনিক অর্থনীতি ও কৌশলগত ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণই হবে মূল চালিকাশক্তি।

