সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর:
দিনাজপুর জেলার পাঁচটি উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষায় এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে সরকারের ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচি। ঘোড়াঘাট, বিরামপুর, কাহারোল, বোচাগঞ্জ ও বিরল উপজেলার ৬০২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্কুল ফিটিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বিরল উপজেলার কাজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ উপজেলার সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
ইকো- সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উদ্যোগে পরিচালিত এই কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে পাঁচ দিন পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। খাদ্য তালিকায় রয়েছে দুটি বনরুটি, সিদ্ধ ডিম ও কলা—যা শিশুদের দৈনন্দিন পুষ্টি ও প্রোটিন চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এর ফলে প্রি-প্রাইমারি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, টিফিন পিরিয়ডে নির্ধারিত স্থান থেকে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বরাদ্দ অনুযায়ী খাবার গ্রহণ করছে। এতে তাদের মধ্যে সততা, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মতো মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটছে। শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবই থেকেই নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমেও গুরুত্বপূর্ণ জীবনদক্ষতা অর্জন করছে।
গত ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর থেকে দিনাজপুর জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে ঘোড়াঘাট, বিরামপুর, কাহারোল, বোচাগঞ্জ ও বিরল এই পাঁচটি উপজেলায় কর্মসূচিটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে। এসব উপজেলার ৩৯টি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় অবস্থিত ৬০২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোট ৬৯ হাজার ৭৭৪ জন শিক্ষার্থী এই কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ ৬২ হাজার ৭৯৭ জন শিক্ষার্থী নিয়মিতভাবে সপ্তাহে পাঁচ দিন দুই পিস বনরুটি, চার দিন একটি করে সিদ্ধ ডিম এবং এক দিন একটি করে কলা পাচ্ছে।
এই কর্মসূচির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো নারী উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ততা। জেলার পাঁচটি উপজেলায় প্রায় ২১০ জন নারী উদ্যোক্তা নিয়মিতভাবে ডিম ও কলা সরবরাহ করছেন। এতে তারা প্রতি সপ্তাহে গড়ে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। ফলে পরিবার ও সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কাজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেন বলে, আগে অনেক সময় না খেয়ে স্কুলে আসতাম। এখন বাড়ি থেকে না খেয়ে আসলেও সমস্যা হয় না। প্রতিদিন স্কুলেই খাবার পাই, তাই স্কুলে আসতে ভালো লাগে এবং পড়ায় মন বসে।
একই শ্রেণির আফসানা মিমি জানায়, “খাবার পাওয়ার কারণে আমরা আর ক্ষুধার্ত থাকি না, ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারি। বাড়ি থেকে আর টিফিন আনতে হয় না।
চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী খায়রুল বাশারও জানায়, আমার মত এখন আর আমাদের বিদ্যালয়ে কেউ স্কুল ফাঁকি দিতে চায় না। ফলে আমাদের লেখাপড়ার মনোযোগী হয়েছি। পুষ্টির চাহিদা পূরণ হচ্ছে এবং বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হারও কমে গিয়েছে।
কাজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জুলফিকার আলী বলেন, স্কুল ফিডিং চালুর পর শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে অনেক শিক্ষার্থী অনিয়মিত ছিল, এখন তারা নিয়মিত স্কুলে আসছে। এতে শিক্ষার পরিবেশও উন্নত হয়েছে। লেখাপড়ার মানোবলও ভালো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের কে এখন আর বিদ্যালয়ে আসার জন্য বলতে হয় না।
কাজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এর শিক্ষার্থী আফসানা মিমির মা রোকেয়া বেগম বলেন, “আমরা সব সময় পুষ্টিকর খাবার দিতে পারি না। স্কুলে খাবার দেওয়ায় দুশ্চিন্তা কমেছে।
অভিভাবক আব্দুল করিম বলেন, “নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য এই কর্মসূচি খুবই সহায়ক। এতে বাচ্চারা নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে। আমাদের মত গরিব মানুষের ছেলেমেয়েদের দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা পূরণ হওয়ায় এই কর্মসূচিকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
ইকো- সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন দিনাজপুর ম্যানেজার শাহ মোঃ আমিনুল হক জানান, “দিনাজপুর জেলার পাঁচটি উপজেলায় ৬০২টি বিদ্যালয়ের প্রায় ৬২ হাজার ৭৯৭ জন শিক্ষার্থী এই কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এটি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিরল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিমরান মোহাম্মদ সায়েক বলেন, “সরকারের এই উদ্যোগ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর ফলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ছে, ঝরে পড়া কমছে এবং শিক্ষার মান উন্নত হচ্ছে। আমরা এর সফল বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে যাচ্ছি। উপজেলার সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্কুল ফিডিং খাদ্যের মান বজায় রাখা এবং নিয়মিত তদারকি করার জন্য হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়েছে। সেই গ্রুপেই প্রতিদিন আপডেট নেওয়া হয়।
তিনি আরোও বলেন , ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচি শুধু শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করছে না, বরং তাদের শিক্ষাজীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ, সচেতন ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলছে।

