আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনা বর্তমানে এক কঠিন মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক অচলাবস্থায় নিমজ্জিত। এই সংকটের মূলে রয়েছে মার্কিন ‘সি ব্লকেড’ বা নৌ-অবরোধ। তেহরানের সাফ কথা—আগে অবরোধ সরাও, তারপর আলোচনা; বিপরীতে ওয়াশিংটনের অবস্থান—আগে আলোচনার টেবিলে বসো, তবেই অবরোধ সরানোর প্রশ্ন আসবে।
এমনকি আলোচনার দিন-ক্ষণ ঠিক করে আমেরিকা যখন সিকিউরিটি প্রোটোকল ও সরঞ্জামের কার্গো বিমান পাঠিয়েছে, তখনও ইরান তাদের অবস্থানে অনড় থেকে সেই আমন্ত্রণে সাড়া দেয়নি। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক ঝটিকা কূটনৈতিক মিশনে বের হয়েছেন। পাকিস্তান, ওমান, রাশিয়া এবং সম্ভবত সৌদি আরব সফরের মধ্য দিয়ে ইরান আবারও প্রমাণ দিচ্ছে যে, কূটনীতির দাবার চালে তারা কতটা কৌশলী।
আরাগচির পর পর দুইবার পাকিস্তান সফর এবং নতুন প্রস্তাব পাঠানোর অর্থ হলো ইরান আলোচনার পথ খোলা রাখতে চায়, তবে নিজেদের মৌলিক শর্ত বিসর্জন দিয়ে নয়। নতুন প্রস্তাবেও নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের দাবিটি পাহাড়ের মতো অটল রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনা সম্ভবত পুনরায় শুরু হবে, তবে তা আর সামনা-সামনি হওয়ার সম্ভাবনা কম। পাকিস্তানের বড় সাফল্য ছিল শত্রুভাবাপন্ন দুই পক্ষকে একই ঘরে বসানো, কিন্তু সেই মুখোমুখি বৈঠক হিতে বিপরীত হয়েছে। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের বরাতে সাংবাদিক মনসুর আলী খান জানিয়েছেন, গত বৈঠকে ইরানি ও মার্কিন প্রতিনিধি দল যখন এক কক্ষে বসেছিল, তখন ভেতর থেকে প্রচণ্ড হৈচৈ ও বাদানুবাদের শব্দ বাইরে আসছিল।
মার্কিন প্রতিনিধি দলের সদস্য স্টিভ উইটকফ ও জেরার্ড কুশনারের দেওয়া তথ্যের সত্যতা এবং জেডি ভ্যান্সের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ইরানিরা মোটেই সহজভাবে নেয়নি। কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভেঙে পরিস্থিতি হাতাহাতি পর্যন্ত গড়িয়েছিল কি না, তা হয়তো কোনোদিন সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ হলে জানা যাবে, তবে সেই তিক্ততা আলোচনার পরিবেশকে বিষিয়ে তুলেছে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরায়েল। যখনই কোনো সমঝোতার সুর শোনা যায়, ঠিক তখনই লেবাননে আক্রমণ তীব্র করে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নস্যাৎ করে দিচ্ছে তারা। কারণ লেবাননে পূর্ণ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া ইরানের অন্যতম প্রধান শর্ত। এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইলেও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছেন না। বরং গুঞ্জন রয়েছে, কুখ্যাত ‘এপস্টাইন ফাইল’ ব্যবহার করে খোদ ট্রাম্পকেই ব্ল্যাকমেইল বা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে ইসরায়েল।
এমনকি ট্রাম্পকে হত্যাচেষ্টাকারী থমাস অ্যালেনের বিষয়টিও এই বৃহত্তর ষড়যন্ত্র তত্ত্বের বাইরে নয়। সব মিলিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার এই দড়ি টানাটানি কেবল দুই দেশের বিষয় নয়, বরং এটি এখন বৈশ্বিক রাজনীতির গভীর এক চোরাবালিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই নতুন কোনো সংকটের জন্ম দিচ্ছে।

