বিশ্বের ১০২টি দেশের মানুষের পাঠাভ্যাস নিয়ে করা সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে বাংলাদেশের চরম উদ্বেগজনক চিত্র। সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন এবং ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ-এর ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, পাঠাভ্যাসের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। অর্থাৎ বিশ্বের মাত্র ৫টি দেশ আমাদের নিচে রয়েছে। বিপরীতে, প্রতিবেশী দেশ ভারত বৈশ্বিক তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করে এক বিস্ময়কর উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।
জরিপ বলছে, বাংলাদেশের একজন মানুষ বছরে গড়ে মাত্র ২.৭৫টি বই পড়েন এবং বই পড়ার পেছনে বছরে ব্যয় করেন মাত্র ৬২ ঘণ্টা। অর্থাৎ দিনে মাত্র ১০ মিনিট! যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের একজন নাগরিক বছরে ১৭টি এবং ভারতের একজন নাগরিক ১৬টি বই পড়েন। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ বছরে ৩৫৭ ঘণ্টা এবং ভারতীয়রা ৩৫২ ঘণ্টা সময় কাটান বইয়ের পাতায়। বাংলাদেশের নিচে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, পাকিস্তান, ব্রুনাই এবং তালিকার সর্বনিম্নে থাকা আফগানিস্তান (বছরে ২.৫৬টি বই)।
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের মানুষের এই পাঠবিমুখতার প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার। বর্তমানে দেশের প্রায় ৭২.৪% পরিবারে স্মার্টফোন রয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় ২৮% চরম ডিজিটাল আসক্তির শিকার।
অ্যাটেনশন স্প্যান কমে যাওয়া: ফেসবুক রিলস বা টিকটকের মতো দ্রুত বিনোদন মানুষের গভীর মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় কোনো তাত্ত্বিক বই বা সাহিত্যে মনোযোগ ধরে রাখা এখন অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
সহজ ডোপামিন বনাম গভীর চিন্তা: বই পড়তে যেখানে মস্তিষ্কের সক্রিয় চিন্তার প্রয়োজন হয়, সেখানে মোবাইলে স্ক্রল করলে দ্রুত ‘ডোপামিন’ (আনন্দদায়ক হরমোন) নিঃসরণ হয়। ফলে মানুষ বইয়ের চেয়ে মোবাইলের দিকেই বেশি ঝুঁকছে।
স্কিমিং বা ভাসা-ভাসা পড়ার অভ্যাস: ডিজিটাল মাধ্যমে আমরা দ্রুত তথ্য খুঁজি, যাকে বলা হয় ‘স্কিমিং’। এই অভ্যাসের ফলে জটিল সাহিত্য বা দীর্ঘ নিবন্ধ পড়ার ধৈর্য হারিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের পাঠ্যদক্ষতা বা রিডিং স্কোর প্রায় ১০% কমিয়ে দিচ্ছে। মোবাইল ফোনের নীল আলোর প্রভাবে তৈরি হওয়া শারীরিক ক্লান্তি এবং মানসিক বিষণ্ণতাও গঠনমূলক পড়াশোনা থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখছে।
গবেষকদের ভাষায়, মোবাইল ফোন নিজে সমস্যা নয়, বরং এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারই সমস্যা। আমরা যদি বই না পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই দিনরাত ডুবে থাকি, তবে পাঠাভ্যাসে নিচের দিকে আফগানিস্তানকে ছাড়িয়ে ‘চ্যাম্পিয়ন’ হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। একটি জ্ঞানভিত্তিক জাতি হিসেবে টিকে থাকতে হলে ডিজিটাল আসক্তি কাটিয়ে বইয়ের পাতায় ফেরার কোনো বিকল্প নেই। নচেৎ, হাতের মুঠোয় থাকা বিনোদনের জোয়ারে একটি জাতির মেধাসম্পদ ও সৃজনশীলতা ধূলিসাৎ হওয়া এখন কেবলই সময়ের অপেক্ষা। (মতামত এবং লিড নিউজ)

