দীর্ঘ ১৩ বছর প্রতীক্ষার পর অবশেষে ধরা পড়ল সিরিয়ার ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ‘তাদামুন গণহত্যা’র প্রধান হোতা আমজাদ ইউসেফ। ২০১৩ সালে দামেস্কের তাদামুন এলাকায় হাত-পা বাঁধা নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের সারিবদ্ধভাবে গর্তে ফেলে গুলি করে হত্যার সেই শিউরে ওঠা ভিডিওটি বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করেছিল। গতকাল সেই ঘাতক অফিসারকে সিরীয় বাহিনীর পক্ষ থেকে গ্রেপ্তারের খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
আমজাদ ইউসেফের পরিচয় শনাক্ত করার পেছনে রয়েছে এক রোমহর্ষক গোয়েন্দা কাহিনী। ভিডিওটি লিক হওয়ার পর ঘাতকদের পরিচয় ছিল অস্পষ্ট। সিরীয় কুর্দি গবেষক আনসার শাহুদ এবং অধ্যাপক উগুর উমিত উনগোর দুই বছর ধরে নিরলস কাজ করেন এর পেছনে। আনসার শাহুদ নিজের পরিচয় গোপন করে একজন বাশার সমর্থক আলাউই নারীর ছদ্মবেশে ফেসবুকে আমজাদ ইউসেফের সাথে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। দীর্ঘ আলোচনার এক পর্যায়ে আমজাদ নিজের অপরাধ স্বীকার করে নেয়, যা তাকে শনাক্ত করার প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে সংঘটিত এই গণহত্যায় অন্তত ৪১ জনকে সরাসরি হত্যার ভিডিও প্রমাণ পাওয়া গেলেও, ধারণা করা হয় এই ‘তাদামুন ম্যাসাকারে’ প্রায় ২৫০ জন মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিহতদের বড় একটি অংশ ছিল ফিলিস্তিনি শরণার্থী, যারা ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর বাস্তুচ্যুত হয়ে সিরিয়ার গোলান হাইটস হয়ে তাদামুনে বসতি গড়েছিল।
সিরীয় গৃহযুদ্ধে বিদ্রোহীদের সমর্থনের অভিযোগে আসাদ বাহিনী ফিলিস্তিনিদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালায়। এর আগে ইয়ারমুক রিফিউজি ক্যাম্পে অবরোধ আরোপ করে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে অনাহারে মৃত্যু মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, যেখানে ক্ষুধার জ্বালায় মানুষ ঘাস খেয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য হয়েছিল।
আমজাদ ইউসেফের গ্রেপ্তারের পর গণহত্যার সেই বধ্যভূমিতে ভিড় জমিয়েছেন স্বজন হারানো শত শত মানুষ। এক সময় যারা নিজেদের ধরাছোঁয়ার বাইরে এবং অপরাজেয় মনে করত, আজ তারা খাঁচাবন্দী। শুধু আমজাদ নয়, স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদকেও আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, যেখানে আরব দেশগুলোও এখন সংহতি প্রকাশ করছে।
“যারা ক্ষমতার দাপটে সীমা লঙ্ঘন করে, এই গ্রেপ্তার তাদের জন্য একটি চরম বার্তা। ন্যায়বিচার বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়া থেকে কাউকেই ক্ষমতা বাঁচাতে পারে না।”
আমজাদ ইউসেফের বিচার এখন কেবল সিরীয়দের জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত মানুষের জন্য এক বড় ধরনের নৈতিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

