দুর্নীতি ও লুটপাটের বিরুদ্ধে যেখানে প্রতিদিন সোচ্চার থাকে জাতীয় সংসদ, সেই সংসদ সচিবালয়েই এবার ক্যামেরার সরঞ্জাম কেনাকাটায় ভয়াবহ ‘হরিলুটের’ অভিযোগ উঠেছে। মাত্র ২০ লাখ টাকা বাজারমূল্যের মালামাল কিনতে সরকারের কোষাগার থেকে খরচ করা হয়েছে প্রায় ৫৯ লাখ টাকা। অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হওয়া এই কেনাকাটার নেপথ্যে বিদায়ী এক শীর্ষ কর্মকর্তার সরাসরি তত্ত্বাবধানের তথ্য মিলেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিটি ক্যামেরা আইটেমের দাম বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ধরা হয়েছে। যেমন:
ক্যামেরা ব্যাগ: বাজারে যার মূল্য মাত্র ৪ হাজার টাকা, সেটি কেনা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪০০ টাকায়। দামী ব্র্যান্ডের নাম থাকলেও দেওয়া হয়েছে নিম্নমানের ব্যাগ, যাতে লোগো লাগানো হয়েছে আলাদাভাবে।
৩ হাজার টাকার কার্ড রিডারের দাম ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৫০০ টাকা।
৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকার ডিজিটাল এসএলআর ক্যামেরা বডি কেনা হয়েছে ৭ লাখ ৯ হাজার ৫০০ টাকায়। চারটি বডির পেছনেই খরচ হয়েছে ২৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকা।
৭৮ হাজার টাকার লেন্স ১ লাখ ২৪ হাজারে এবং ১০-১৫ হাজার টাকার স্পিডলাইট (ফ্ল্যাশ) কেনা হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৫০ টাকায়।
সব মিলিয়ে ১২টি আইটেমের একটি সেটের জন্য বিল করা হয়েছে ৫৮ লাখ ৪৪ হাজার ১৩০ টাকা, যা সংশ্লিষ্টদের মতে চরম অস্বাভাবিক।
তড়িঘড়ি কেনাকাটা ও নেপথ্যের কারিগর বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার গঠনের পর এটিই সংসদ সচিবালয়ের প্রথম বড় কেনাকাটা। গত ১২ মার্চ সংসদের যাত্রা শুরুর পর ২৫ মার্চ কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং মাত্র ১৯ দিনের মাথায় ১৫ এপ্রিল মালামাল সরবরাহ করা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, সংসদ সচিবালয় থেকে সদ্য বিদায় নেওয়া সচিব কানিজ মাওলা নিজে এই কেনাকাটা তত্ত্বাবধান করেছেন। নিয়ম রক্ষার সব কাগজ ঠিকঠাক রেখে নিজের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে তিনি তড়িঘড়ি প্রক্রিয়া শেষ করেন বলে সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে।
নামসর্বস্ব সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সরঞ্জামগুলো সরবরাহ করেছে মগবাজারের ‘সেফ ট্রেডার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির কোনো ওয়েবসাইট নেই। এর জেনারেল ম্যানেজার মিরাজুল ইসলাম বলেন, “ভ্যাট-ট্যাক্স এবং দামী ব্র্যান্ডের কারণে দাম বেশি পড়েছে।” তবে বাজারমূল্যের আকাশচুম্বী পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন করতেই তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন।
বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের ভাষ্য সংসদ সচিবালয়ে দীর্ঘ ২০ বছর কর্মরত এক ফটোগ্রাফার জানান, ৪ থেকে ১০ লাখ টাকার সেট দিয়েই অধিবেশন কক্ষের সেরা ছবি তোলা সম্ভব। সেখানে ৫৮ লাখ টাকার কেনাকাটা তার কর্মজীবনে দেখেননি। এমনকি জাপানি কোম্পানি ‘নিক্কন’-এর মালামাল দেওয়ার কথা থাকলেও সরবরাহ করা হয়েছে ‘সিমপেক্স’ ব্র্যান্ডের নিম্নমানের পণ্য।
কার্যাদেশে স্বাক্ষরকারী সিনিয়র সহকারী সচিব মো. মহিদুল হক জানান, তিনি নতুন জয়েন করেছেন এবং পদাধিকার বলে স্বাক্ষর করতে হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি তার যোগদানের আগেই চূড়ান্ত করা হয়েছিল।
কাগজে-কলমে সব নিয়ম মেনে ‘সিস্টেমেটিক দুর্নীতি’র এই ভয়াবহ চিত্র এখন সংসদ সচিবালয়ের অন্দরে আলোচনার প্রধান বিষয়। এই হরিলুটের সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি তুলেছেন সচেতন মহল।

