ঢাকা ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, নির্বাচনের মাত্র দুই মাস যেতে না যেতেই তাতে বিভক্তির ছায়া দেখা দিচ্ছে। জুলাই বিপ্লবের ফসল হিসেবে জাতীয় ঐক্যের যে আবহ তৈরি হয়েছিল, তা এখন ‘সংবিধান সংস্কার’ এবং ‘অধ্যাদেশ পাস’ করার মতো মৌলিক প্রশ্নে হোঁচট খাচ্ছে।
ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার এই দূরত্ব এখন আর কেবল সংসদের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রাজপথে গড়িয়েছে।বিরোধের মূলে কী?প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দলের মধ্যে নীতিগত ও কৌশলগত তিনটি প্রধান ইস্যুতে বিরোধ তুঙ্গে:সংবিধান সংস্কার পরিষদ: নির্বাচিত এমপিদের এই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া নিয়ে প্রথম মতবিরোধ দেখা দেয়।
সরকারি দল (বিএনপি) এই শপথ থেকে বিরত থাকায় বিরোধী দল ক্ষুব্ধ হয়।অধ্যাদেশ যাচাই ও পাস: অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশ পাসের ক্ষেত্রে গঠিত বিশেষ কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করার অভিযোগ তুলেছে বিরোধী দল। বিশেষ করে পুলিশ কমিশন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশে শেষ মুহূর্তে সংশোধনী আনাকে ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ হিসেবে দেখছে জামায়াত।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন: জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও সংস্কারের যে রূপরেখা (জুলাই সনদ) তৈরি হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে দুই দলের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।সংসদ বনাম রাজপথ: সংঘাতের নতুন মোড়সংসদে এ পর্যন্ত ৪ বার ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট জানিয়েছেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা আদায়ে তারা প্রয়োজনে সংসদ ছেড়ে রাজপথে লড়াই করবেন। ইতিমধ্যে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ১৫ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে এবং রাজধানীতে গণমিছিল করেছে।
আগামী ২ মে পর্যন্ত জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে তাদের এই আন্দোলন বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।নেতৃত্বের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যপ্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: তিনি দেশ পরিচালনায় বিরোধী দলের সহযোগিতা কামনা করলেও সম্প্রতি টাঙ্গাইলের এক অনুষ্ঠানে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ‘স্বৈরাচারের ভূত’ যেন উন্নয়ন কাজে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। তিনি সংসদকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করার ওপর জোর দিয়েছেন।বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান: তিনি সরকারি দলের আচরণে ‘ফ্যাসিবাদের কালো ছায়া’ দেখার অভিযোগ তুলেছেন।
তার মতে, জনগণের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে তারা আপসহীন থাকবেন।জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম: তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে কোনো সরকারই টিকে থাকতে পারবে না।বিশ্লেষকদের উদ্বেগ: ‘জনগণের প্রত্যাশা যেন ফিকে না হয়’ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের মতে, দ্রুত সবকিছু আলোচনার টেবিল (সংসদ) থেকে রাজপথে চলে যাওয়া গণতন্ত্রের জন্য শুভকর নয়।
তিনি মনে করেন, জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে দলগুলোর উচিত তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার পর্যালোচনা করা এবং বিবাদ কমিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা।এক নজরে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি (২০২৬)বিষয়সরকারি দলের অবস্থান (বিএনপি)বিরোধী দলের অবস্থান (জামায়াত ও জোট)সংবিধান সংস্কারসংসদের কার্যপ্রণালী অনুযায়ী অগ্রসর হতে চায়।
গণভোটের রায় অনুযায়ী দ্রুত বৈঠকের দাবি।অধ্যাদেশ পাসসময়ের স্বল্পতায় কিছু ভ্রান্তি হতে পারে, যা পরে সংশোধনযোগ্য।বিশেষ কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করাকে ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ মনে করে।কৌশলউন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ।সংসদীয় প্রতিবাদের পাশাপাশি রাজপথে আন্দোলনের ডাক।উপসংহার: বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক স্পর্শকাতর সময় পার করছে।
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি আস্থার কথা বললেও, মাঠের রাজনীতি বলছে ভিন্ন কথা। জুলাই বিপ্লবের অর্জন ধরে রাখতে হলে দুই পক্ষকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে সংলাপে বসা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।এই রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আপনার আরও কোনো নির্দিষ্ট বিশ্লেষণ বা কোনো নেতার বক্তব্যের ওপর আলাদা প্রতিবেদন প্রয়োজন হলে জানাতে পারেন।

