ইরান যে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির এক ধুরন্ধর খেলোয়াড়, তা আবারো প্রমাণিত হলো ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর তথ্যে।
আমেরিকা যখন ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরোধ করার জন্য নৌ-অবরোধের পরিকল্পনা করছে, তেহরান তখন অনেক ধাপ এগিয়ে নিজের চাল চেলে রেখেছে। সম্ভাব্য অবরোধের আশঙ্কায় ইরান আগেই প্রায় ১৬০ থেকে ১৮০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বিশাল বিশাল সুপার ট্যাঙ্কারে করে গভীর সমুদ্রে নিয়ে গেছে। এই ‘ভাসমান তেলের খনি’ মূলত আমেরিকার যেকোনো সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর একটি মাস্টারপ্ল্যান। ইরান প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ১৮ লক্ষ ব্যারেল তেল বিক্রি করে; সেই হিসাবে সাগরে মজুত রাখা এই তেল দিয়ে তারা অন্তত তিন মাস অনায়াসেই আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সচল রাখতে পারবে।
এই কৌশলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর নমনীয়তা। সমুদ্রের মাঝখানে থাকায় এই তেল ডলারের পাশাপাশি বিকল্প মুদ্রায় কেনাবেচা করা সম্ভব, যার প্রধান ক্রেতা চীন। যেহেতু ইরানের তেলের প্রায় ৮০-৯০ শতাংশই চীনে যায়, তাই ওয়াশিংটন চাইলেও বেইজিংয়ের এই জ্বালানি উৎস পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে না। যদিও দীর্ঘমেয়াদী অবরোধে ইরানের তেল উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তবে বাস্তবতা হলো—তিন মাস তেলের বাজার অস্থির থাকলে ইরান নয়, বরং খোদ বিশ্ব অর্থনীতিতেই ‘মহা-মড়ক’ দেখা দেবে। জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম আর সরবরাহ সংকটে বিশ্বব্যাপী যে মহামন্দা শুরু হবে, তা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা আমেরিকারও নেই।
মজার বিষয় হলো, আমেরিকার এই তথাকথিত নৌ-অবরোধ বা চাপ সৃষ্টির আসল লক্ষ্য হয়তো কেবল ইরান নয়, বরং নিজেদের মিত্র ইউরোপীয় দেশগুলো। চলমান সংঘাতে ইউরোপীয় দেশগুলো আমেরিকাকে প্রত্যাশিত সামরিক সহায়তা না দেওয়ায়, ট্রাম্প প্রশাসন মূলত তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে তাদের ওপর এক ধরনের প্রতিশোধমূলক চাপ সৃষ্টি করছে। ওয়াশিংটন চাচ্ছে ইউরোপীয় দেশগুলোই যেন সংকটে পড়ে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করতে আমেরিকার সামরিক অভিযানে সরাসরি যোগ দেয়। তবে ইরানের এই ‘অপ্রতিসম অর্থনৈতিক যুদ্ধকৌশল’ এবং তিন মাসের আগাম মজুত প্রমাণ করে যে, তারা কোনো আনাড়ি শক্তি নয়। ট্রাম্পের তৈরি করা এই প্রেশার কুকার কূটনীতি শেষ পর্যন্ত আমেরিকার নিজের জন্যই বুমেরাং হয়ে দেখা দিতে

