জান্নাত আক্তার রিয়া, বিশেষ প্রতিনিধি:
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে একদল তরুণী এবং কিছু নামসর্বস্ব অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সমাজ ও সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাত করছে। এদের মধ্যে মাহাবুবা মাসুদ লরিন নামের এক তরুণীর কর্মকাণ্ড বর্তমানে চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিজের ফেসবুক আইডিতে ৪৩ হাজারেরও বেশি অনুসারী থাকা এই নারী নিয়মিতভাবে এমন সব ভিডিও এবং লাইভ প্রচার করছেন যা কেবল কুরুচিপূর্ণই নয়, বরং আমাদের হাজার বছরের বাঙালি ঐতিহ্যের পরিপন্থী। লরিন তার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে নিজেকে “বাংলাদেশের সানি লিওন” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন।
ভিডিওগুলোতে লরিনের কথোপকথন বিশ্লেষণ করলে তার আদর্শিক বিচ্যুতি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। একটি ভিডিওতে তাকে দেখা যায় রিকশায় বসে প্রকাশ্যে ধূমপান করতে। সেখানে তিনি উচ্চস্বরে দাবি করছেন যে, মেয়েরা আগে যা বাসায় করতো এখন তা প্রকাশ্যেই করা উচিত এবং এটিই নাকি প্রকৃত স্বাধীনতা। তার এই বাচনভঙ্গি এবং দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত উস্কানিমূলক। তিনি সরাসরি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলেন যে, তিনি সানি লিওনের একনিষ্ঠ ভক্ত এবং সুযোগ পেলে তার মতো বিতর্কিত ক্যারিয়ারই বেছে নিতেন। লরিন যখন দম্ভের সাথে ঘোষণা করেন যে তিনি পুরুষদের “রাতের ঘুম হারাম” করে দেবেন, তখন এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে তার লক্ষ্য কোনো সৃজনশীল কাজ নয়, বরং সমাজকে এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে ঠেলে দেওয়া।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো এই ভিডিওগুলোতে লরিনের শারীরিক অঙ্গভঙ্গি এবং পোশাকের প্রদর্শন। তিনি সচেতনভাবেই এমন সব খোলামেলা এবং অফ-শোল্ডার পোশাক পরিধান করেন যা সাধারণ জনাকীর্ণ স্থানে অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ও অস্বস্তিকর। ভিডিও ধারণের সময় তিনি বারবার তার শরীরের স্পর্শকাতর অংশগুলোকে ক্যামেরার সামনে বিভিন্ন কায়দায় প্রদর্শন করেন, যা সুস্থ বিনোদনের সংজ্ঞায় পড়ে না। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশ ও জনতার কন্ঠ, News Time, Bnews24 বা Viral News Pro -এর মতো তথাকথিত নিউজ চ্যানেলগুলো এই দৃশ্যগুলো ধারণ করার সময় কোনো ধরনের নৈতিকতা বজায় রাখে না। ভিডিও এডিটিং করার সময় তারা লরিনের পোশাকের ফাঁক দিয়ে দৃশ্যমান শরীরের অংশগুলোকে ব্লার বা অস্পষ্ট করার প্রয়োজন মনে করে না। বরং তারা ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল এমনভাবে সেট করে যাতে এই অশালীনতা আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে এবং ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয়।
এই ছদ্মবেশী গণমাধ্যমগুলো মূলত এক ধরনের “ডিজিটাল ট্রাফিকিং” বা ভিউ পাওয়ার নোংরা ব্যবসায় লিপ্ত। তাদের নামগুলো এমনভাবে রাখা হয়েছে যাতে সাধারণ মানুষ মনে করে এগুলো কোনো নিবন্ধিত নিউজ চ্যানেল। এই চ্যানেলগুলোর কথিত রিপোর্টাররা লরিনকে এমন সব কুরুচিপূর্ণ প্রশ্ন করেন যা তাকে আরও অশ্লীল কথা বলতে উৎসাহিত করে। এটি কোনোভাবেই সাংবাদিকতা নয়, বরং এটি জেনেশুনেই সমাজের নৈতিক অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করার একটি অপকৌশল। তারা লরিনকে ব্যবহার করে মূলত অশ্লীলতাকে পুঁজি করে তাদের সাবস্ক্রাইবার বাড়াতে চায়।
বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ যখন দেখা যায়, ইউটিউব বা ফেসবুকের মাধ্যমে এই বিষাক্ত কন্টেন্টগুলো আমাদের আগামী প্রজন্মের হাতের নাগালে চলে আসছে। ছোট ছোট শিশুরা যখন কোনো কার্টুন বা শিক্ষণীয় বিষয় খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ লরিনের মতো ব্যক্তিদের এমন অশ্লীল ইঙ্গিতপূর্ণ ভিডিওর সম্মুখীন হয়, তখন তাদের কোমল মনে বিরূপ প্রভাব পড়ে। লরিন যখন দম্ভের সাথে নিজেকে সানি লিওনের উত্তরসূরি দাবি করেন, তখন শিশুরা মনে করতে শুরু করে যে মেধা বা শ্রমের চেয়ে শরীরের প্রদর্শন আর বিতর্কিত কথা বলাই হয়তো জনপ্রিয় হওয়ার সহজ পথ। এই ধরনের “নেতিবাচক ভাইরাল কালচার” শিশুদের চরিত্র ও নৈতিকতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে আমাদের এখনই রুখে দাঁড়াতে হবে। গ্ল্যামার আর আধুনিকতার মোড়কে এই ধরনের অশ্লীলতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। লরিনের মতো যারা সানি লিওনকে আইডল মেনে সুস্থ সমাজকে কলুষিত করার স্বপ্নে বিভোর এবং যে সমস্ত তথাকথিত নিউজ চ্যানেল তাদের মদদ দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক ও আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। মেধা ও শ্রমের পরিবর্তে শরীর প্রদর্শন আর বিতর্কিত মন্তব্য দিয়ে যারা তারকা হতে চায়, তাদের বয়কট করাই হোক আমাদের আজকের প্রতিবাদ। আমরা এমন এক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম চাই না যারা ইন্টারনেটে ঢুকে নৈতিকতার পাঠ ভুলে গিয়ে সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটবে। সুস্থ সংস্কৃতির জয় হোক এবং এই ধরনের অপসংস্কৃতি ও ছদ্মবেশী সংবাদমাধ্যম চিরতরে নির্মূল হোক।

