মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে তখনো ধোঁয়ার রেখা ভাসছে। ভোরের আলো ফুটতেই খবরটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে—ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। একই হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানসহ উচ্চপর্যায়ের আরও কয়েকজন কর্মকর্তার মৃত্যুর খবর আসে। শুধু গত ২৪ ঘণ্টায় তেহরানেই প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৫৭ জন বেসামরিক নাগরিক।
খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। বিভিন্ন দেশ শোক ও নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন খামেনির হত্যাকাণ্ডে গভীর শোক প্রকাশ করেন। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকে।
শনিবার, হামলার জবাব দিতে শুরু করে ইরান। প্রথমে ইসরায়েল লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানো হয়। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে—বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে—সেসব ঘাঁটিতেও হামলা চালায় ইরান। আকাশজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার শব্দ, বিস্ফোরণের ঝলক আর আতঙ্কে ছুটে চলা মানুষের দৃশ্য যেন এক নতুন সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলায় একজন বাংলাদেশি, একজন পাকিস্তানি ও একজন নেপালি নাগরিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৫৮ জন। তারা আরও জানায়, ১৬৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৫২টি ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিহত করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে ঢাকায়ও বাড়তে থাকে উদ্বেগ। শনিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জরুরি বৈঠক করে। ঐ অঞ্চলে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সকল পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন, উত্তেজনা পরিহার এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের আহ্বান জানানো হয়।
রোববার ভোরে খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হলে উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। বিকেলে ঢাকায় বিক্ষোভ করে দেশের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
এমন প্রেক্ষাপটে রোববার বিকেলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। সেখানে ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনায় নিন্দা জানানো হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, চলমান শত্রুতা আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও বেসামরিক জনগণের কল্যাণকে বিপন্ন করছে। তবে বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম উল্লেখ করা হয়নি, এবং ইরানে প্রাথমিক হামলারও কোনো নিন্দা জানানো হয়নি—যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয় তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।
মন্তব্যের জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
কূটনীতিক বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিকদের অনেকে এই অবস্থানকে ‘একপেশে’ বলে মনে করছেন। চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত ন্যায়সংগত হওয়া উচিত ছিল। তাঁর প্রশ্ন—বাংলাদেশের এই বিবৃতি কি কোনো চাপে দেওয়া হয়েছে, নাকি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজ উদ্যোগে এমন অবস্থান নিয়েছে?
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাহাব এনাম খানও বলেন, সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশকে আগ্রাসনের বিরোধিতা করতে হয় এবং আন্তর্জাতিক বিরোধ শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে থাকতে হয়। তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে সব পক্ষের নাম উল্লেখ করে দুই দিকের হামলারই নিন্দা জানানো উচিত ছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত আকাশের নিচে তাই এখন শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের লড়াই নয়, কূটনৈতিক ভাষারও লড়াই চলছে। একদিকে প্রতিশোধ আর প্রতিরোধের হিসাব, অন্যদিকে সংযম ও শান্তির আহ্বান। আর এই অস্থিরতার মাঝখানে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন সাধারণ মানুষ—তেহরান থেকে দুবাই, দোহা থেকে ঢাকায় থাকা স্বজনদের পরিবার পর্যন্ত।

