জাতীয় মানবাধিকার সংক্রান্ত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিলকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীদের উদ্বেগ এবং সংসদে উপস্থাপিত তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে মানবাধিকার কমিশনের কয়েকজন কমিশনার একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেছেন। এর জবাবে আইনমন্ত্রী বিষয়টিকে “ভুল ব্যাখ্যা” বলে উল্লেখ করেছেন।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন থেকে খোলা চিঠি
খোলা চিঠিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাস না হওয়ায় ভুক্তভোগীরা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন এবং বারবার জানতে চাইছেন—“এখন আমাদের কী হবে?” এই দায়বদ্ধতা থেকেই ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের বাইরে গিয়ে তারা চিঠিটি প্রকাশ করেছেন বলে জানান কমিশনাররা।
সংসদে ‘ভুল তথ্য’ উপস্থাপনের অভিযোগ
চিঠিতে দাবি করা হয়, অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে সংসদে একাধিক ভুল তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথমত, গুমের শাস্তি “মাত্র ১০ বছর” বলা হয়েছে—যা কমিশনারদের মতে বিভ্রান্তিকর। তারা বলেন, সংশ্লিষ্ট আইনে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন শাস্তির বিধান রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, তদন্তের সময়সীমা ও জরিমানা আদায়ের কোনো ব্যবস্থা নেই—এমন দাবিও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, অধ্যাদেশে তদন্তের নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং দায়বদ্ধতার স্পষ্ট বিধান ছিল।
তৃতীয়ত, আইসিটি আইন যথেষ্ট—এই যুক্তিরও বিরোধিতা করা হয়েছে। কমিশনাররা বলেন, আইসিটি আইন কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে পারে, কিন্তু বিচ্ছিন্ন গুমের মতো ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়।
আইনি শূন্যতার আশঙ্কা
চিঠিতে আরও বলা হয়, অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার ফলে ভবিষ্যতে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো ফৌজদারি আইনে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত না-থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এতে ভুক্তভোগীরা কার্যকর প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
এছাড়া, পুনর্বহাল করা ২০০৯ সালের আইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতা সীমিত বলেও উল্লেখ করা হয়।
সরকারের আপত্তি নিয়ে প্রশ্ন
কমিশনাররা অভিযোগ করেন, সরকারের মূল আপত্তিগুলো কমিশনের স্বাধীনতা সীমিত করার দিকে নির্দেশ করে। এর মধ্যে রয়েছে:
* কমিশনকে মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার প্রস্তাব
* নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা
* জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে কিছু আটককে গুমের সংজ্ঞার বাইরে রাখা
* কমিশনার নিয়োগে সরকারি প্রভাব বাড়ানোর উদ্যোগ
আইন প্রণয়ন নিয়ে ভবিষ্যৎ উদ্বেগ
চিঠিতে বলা হয়, সরকার একদিকে শক্তিশালী আইন তৈরির কথা বললেও, আপত্তিগুলো গ্রহণ করা হলে আইন দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কমিশনাররা মনে করেন, অধ্যাদেশ বাতিল না করেও সংশোধনের সুযোগ ছিল।
আইনমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, কমিশনারদের বক্তব্য “সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে”। তিনি ব্যাখ্যা দেন, “সর্বোচ্চ ১০ বছর” বলতে ১০ বছরের বেশি নয়—এটি আইনি পরিভাষায় স্পষ্ট।
তিনি আরও বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারিত থাকলেও, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়সীমা নির্দিষ্ট না থাকাকে সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
খোলা চিঠির জবাবে লিখিত প্রতিক্রিয়া দেবেন কি না—এ প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেন, “এর প্রয়োজন নেই। দেশের মানুষ বিষয়টি বুঝতে পারে।”
গত সপ্তাহে জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল পাস হয়। এর ফলে ২০০৯ সালের আইন পুনরায় কার্যকর হয় এবং সাম্প্রতিক অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়ে যায়।
অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে মানবাধিকার সুরক্ষা, গুম প্রতিরোধ এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা এখন জনপরিসরে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে সরকারের অবস্থান, অন্যদিকে কমিশনারদের উদ্বেগ—দুইয়ের মধ্যে এই মতপার্থক্য ভবিষ্যৎ আইন প্রণয়নে কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
