প্রযুক্তি দৈত্য Apple আবারও এক অদ্ভুত সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় কিছু iPhone ব্যবহারকারী লক্ষ্য করেছেন, যখন তারা Apple-এর Dictation টুল ব্যবহার করে “racist” শব্দটি উচ্চারণ করছেন, তখন সফটওয়্যার সেটিকে “Trump” হিসেবে টাইপ করছে।
এই অস্বাভাবিক ঘটনাটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। Apple দ্রুতই প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে যে এটি Dictation টুলের স্পিচ রিকগনিশন সমস্যার কারণে ঘটছে এবং তারা এই সমস্যা সমাধানের জন্য দ্রুত কাজ করছে। তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি শুধুমাত্র কোনো সাধারণ গ্লিচ নয়, বরং সম্ভবত সফটওয়্যারের কোনো অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে।
কীভাবে এই সমস্যা সামনে এলো?
প্রথমে কিছু ব্যবহারকারী TikTok, Twitter (বর্তমানে X), এবং Reddit-এর মাধ্যমে এই সমস্যার ভিডিও শেয়ার করতে শুরু করেন। ভিডিওতে দেখা যায়, iPhone-এর Dictation ফিচার ব্যবহার করে “racist” শব্দটি বললে, সেটি “Trump” হিসেবে টাইপ হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে আবার শব্দটি Trump থেকে “racist”-এ পরিবর্তিত হয়, যা সমস্যাটিকে আরও রহস্যজনক করে তুলেছে।
BBC এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যম যখন এটি যাচাই করার চেষ্টা করে, তখন দেখা যায় যে সমস্যাটি ক্রমেই কমে আসছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে Apple ইতোমধ্যে এটি সমাধান করা শুরু করেছে।
Apple-এর প্রতিক্রিয়া
Apple তাদের এক বিবৃতিতে বলেছে:
“আমরা Dictation ফিচারের স্পিচ রিকগনিশন মডেলের একটি সমস্যার ব্যাপারে অবগত হয়েছি এবং আমরা আজই এটি সংশোধনের জন্য আপডেট রোলআউট করছি।”
তবে, অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন Apple-এর দেওয়া এই ব্যাখ্যা যুক্তিযুক্ত নয়। এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পিচ টেকনোলজি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর পিটার বেল মনে করেন, Apple-এর ব্যাখ্যা পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন,
“এই শব্দ দুটি (‘racist’ এবং ‘Trump’) ফনেটিকভাবে এতটাই আলাদা যে, সাধারণ AI মডেল কখনও একটিকে অন্যটির সাথে গুলিয়ে ফেলবে না।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, সাধারণত Apple-এর মতো বড় প্রতিষ্ঠান তাদের AI ভাষার মডেলকে শত-সহস্র ঘণ্টার স্পিচ ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষিত করে, যা এমন ভুল হওয়ার সম্ভাবনাকে একেবারে কমিয়ে দেয়। ফলে এটি শুধু একটি সাধারণ সফটওয়্যার সমস্যা নাও হতে পারে।
Apple-এর Dictation টুল মূলত AI (Artificial Intelligence) এবং NLP (Natural Language Processing) মডেলের উপর ভিত্তি করে কাজ করে। এই মডেলগুলি মানুষের বলা শব্দ শুনে সেগুলোকে পাঠ্যরূপে রূপান্তর করে।
এই প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়:
- Acoustic Model: শব্দের তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করা হয় কোন শব্দ বলা হয়েছে।
- Language Model: পাঠ্যের প্রেক্ষাপট দেখে AI অনুমান করে কোন শব্দটি ব্যবহার করা উচিত।
- Pronunciation Model: বিভিন্ন উচ্চারণ বিশ্লেষণ করে সঠিক শব্দ চয়ন করা হয়।
এক্ষেত্রে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, “racist” শব্দটি “Trump”-এ পরিণত হওয়া কোনো সাধারণ অ্যালগরিদমিক ভুল নয়। বরং সম্ভবত এটি উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা হয়েছে বা কোনো প্রোগ্রামিং গ্লিচের কারণে ঘটেছে।
Apple-এর AI সংক্রান্ত সাম্প্রতিক বিতর্ক
এটি প্রথম নয় যে, Apple-এর AI প্রযুক্তি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কিছুদিন আগেই Apple News-এর AI-চালিত সারাংশ তৈরি করা ফিচারকে সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল, কারণ এটি বিভিন্ন ভুল তথ্য দেখাচ্ছিল।
একটি ভুল সারাংশে বলা হয়েছিল যে বিশ্বখ্যাত টেনিস তারকা রাফায়েল নাদাল সমকামী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, যা সম্পূর্ণ ভুল তথ্য ছিল। এই ঘটনার পর Apple তাদের AI মডেলে পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দেয়।
এটি লক্ষণীয় যে, এই Dictation সমস্যার সঙ্গে “Trump” শব্দটি জড়িয়ে যাওয়ার ফলে রাজনৈতিক বিতর্কও সৃষ্টি হয়েছে।
একের পর এক বিতর্কের মধ্যে Apple সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা আগামী চার বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে $500 বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে, যার মধ্যে একটি বড় AI গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।
এই ঘটনার প্রভাব
Apple-এর Dictation সমস্যার কারণে সাধারণ ব্যবহারকারীরা প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।
অনেক প্রযুক্তিবিদ এবং সাংবাদিক বলছেন যে,
“এ ধরনের ভুল হলে মানুষের AI প্রযুক্তির উপর থেকে আস্থা কমে যাবে। ভবিষ্যতে বড় কোম্পানিগুলোর উচিত তাদের AI প্রযুক্তি আরও স্বচ্ছ এবং নির্ভরযোগ্য করে তোলা।”
এদিকে, কিছু ব্যবহারকারী মজার ছলে বলছেন,
“Apple কি ইচ্ছা করেই এমন করেছে, নাকি এটি AI-এর কোনো গোপন বার্তা?”
Apple-এর Dictation টুলে “racist” শব্দের পরিবর্তে “Trump” আসার ঘটনাটি একটি সাধারণ প্রযুক্তিগত সমস্যা নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিছু, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে, Apple দ্রুতই সমস্যাটি সমাধান করার জন্য কাজ শুরু করেছে, যা ইতিমধ্যেই কার্যকর হতে শুরু করেছে।
এই ঘটনার ফলে AI প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যবহারকারীর গোপনীয়তার বিষয়গুলো নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে Apple এবং অন্যান্য প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কীভাবে AI-এর উন্নয়ন ঘটায় এবং ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা উন্নত করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।