মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সম্ভাব্য সামরিক হামলার হুমকি দেওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), কাতার এবং কুয়েত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা ইরানে হামলার জন্য মার্কিন বাহিনীকে তাদের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেবে না।
এতে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনা বড় ধাক্কা খেয়েছে, কারণ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদাররা এবার সরাসরি কোনো সামরিক সংঘাতে জড়াতে চাইছে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর এই নিষেধাজ্ঞা ইরানকে কূটনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
যুদ্ধের ঝুঁকি ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সতর্ক অবস্থান

একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইলেও তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি সামরিক অভিযানের অংশ হতে চায় না। দেশগুলো মনে করছে, এই যুদ্ধ তাদের জন্য ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর সিদ্ধান্ত মূলত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার কৌশল। তারা মনে করছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সরাসরি হামলা চালায়, তবে ইরান প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা চালাতে পারে, যা তাদের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
মার্কিন কৌশল ও ইরানের প্রতিক্রিয়া
মার্কিন প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মার্চ মাসে ওয়াশিংটন ডিসিতে আমিরাত ও সৌদি প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক গোপন বৈঠক করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ওই বৈঠকের পরই ইয়েমেনের হুথিদের উপর যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে। যদিও সেই সময় উপসাগরীয় দেশগুলো কিছুটা নীরব থাকলেও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে তারা সরাসরি বিরোধিতা করছে।
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওমানের মাধ্যমে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন, যেখানে নতুন পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে ইরান এখনো কোনো সমঝোতায় রাজি হয়নি।
২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেন। চুক্তির আওতায় ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পেয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল করার পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা তেহরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়ানোর দিকে ঠেলে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প পরিকল্পনা

উপসাগরীয় দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র এখন ভারত মহাসাগরে অবস্থিত তাদের ডিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটিতে বি-২ বোমারু বিমান মোতায়েন করেছে। এটি স্পষ্ট যে, মার্কিন বাহিনী বিকল্প ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করতে জর্ডান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর বিভিন্ন ঘাঁটিতে সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণ বাড়িয়েছে। ওপেন সোর্স বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পণ্যবাহী বিমানের উপস্থিতি গত সময়ের তুলনায় প্রায় ৫০% বৃদ্ধি পেয়েছে।
সামনের পরিস্থিতি কী হতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সামরিক অভিযান চালায়, তবে পুরো অঞ্চলে ভয়াবহ সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইরানও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের (যেমন হুথি বিদ্রোহী, হিজবুল্লাহ, সিরিয়া ও ইরাকি মিলিশিয়া) মাধ্যমে পাল্টা হামলা চালাতে পারে।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল অবস্থায় রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হলেও তারা বিকল্প পথে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ইরানও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে কূটনৈতিকভাবে কাজ করছে।
এখন দেখার বিষয়, মার্কিন প্রশাসন কীভাবে এই সংকট সামাল দেয় এবং ভবিষ্যতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা কোন দিকে মোড় নেয়।