শনিবার ভোরের অন্ধকারে শুরু হয়েছিল হামলা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান অভিযানের লক্ষ্যবস্তু ছিল ইরানের সামরিক স্থাপনা—কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খবর ছড়িয়ে পড়ে, নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (Ayatollah Ali Khamenei)। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ধোঁয়ার রেখা মিলিয়ে যাওয়ার আগেই বিশ্বরাজনীতিতে শুরু হয় অনিশ্চয়তার নতুন অধ্যায়।
হামলার আগে ও পরে ওয়াশিংটনের ভাষ্য ছিল কঠোর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার পাশাপাশি তেহরানের শাসনগোষ্ঠীকে সরিয়ে দেওয়াও তাদের কৌশলগত লক্ষ্য। রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল (Truth Social)–এ দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি ইরানিদের উদ্দেশে বলেন, “এই মুহূর্তটিকে কাজে লাগান এবং আপনাদের দেশকে ফিরিয়ে নিন।”
কিন্তু প্রকাশ্য আহ্বানের আড়ালে ছিল সংশয়। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে পরিচিত একাধিক কর্মকর্তা নীরবে বলছিলেন—১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে গড়ে ওঠা এই ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা কি এত সহজে ভেঙে পড়বে? ইরানের বিপর্যস্ত ও বিভক্ত বিরোধী দলগুলো কি আদৌ ক্ষমতার পালাবদল ঘটাতে পারবে?
বার্তা সংস্থা রয়টার্স (Reuters)–এর সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন কর্মকর্তা সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেননি। চলমান হামলায় ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা নিহত হয়েছেন, জানুয়ারিতে বিক্ষোভ দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ায় সরকার জনরোষের মুখেও পড়েছিল। তবু তাঁদের মতে, অদূর ভবিষ্যতে নাটকীয় পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে হোয়াইট হাউসে জমা দেওয়া সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (Central Intelligence Agency)–এর এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, খামেনি নিহত হলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (Islamic Revolutionary Guard Corps)–এর কোনো প্রভাবশালী নেতা অথবা সমমনা কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। অভ্যন্তরীণ আলোচনায় যুক্ত এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, আইআরজিসি সহজে আত্মসমর্পণ করবে—এমনটা ভাবার কারণ নেই। কারণ তারা কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়, বরং বিস্তৃত সুবিধাভোগী নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু।
আরেক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে আসে জানুয়ারির বিক্ষোভের সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর বলপ্রয়োগ করলেও আইআরজিসির কোনো সদস্য দলত্যাগ করেননি। অথচ ইতিহাস বলে, সফল বিপ্লবের পূর্বশর্তই হলো ক্ষমতাসীন বলয়ের ভাঙন।
এর মধ্যেই তেহরান থেকে আসে আরেক ঘোষণা। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান (Masoud Pezeshkian) জানান, বিচার বিভাগের প্রধান, গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন সদস্য এবং তিনি—এই তিনজনকে নিয়ে একটি ‘পরিচালনা পর্ষদ’ সাময়িকভাবে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেবে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানি (Ali Larijani) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দেশকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনেন এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। তবে এসব দাবির স্বাধীন যাচাই তখনও সম্ভব হয়নি।
ওয়াশিংটনে একই সময়ে চলছিল ভিন্ন সুরের আলোচনা। খামেনিকে হত্যা করলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সম্ভাব্য আলোচনায় কী প্রভাব পড়বে—এ নিয়ে জানুয়ারি থেকেই বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বিতর্ক চলছে, কিন্তু কোনো ঐকমত্য হয়নি। কেউ বলছেন, নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও কৌশলগত নীতিতে বড় পরিবর্তন নাও আসতে পারে। অন্যরা মনে করছেন, ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসে আলোচনার নতুন জানালা খুলতেও পারে।
এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে ট্রাম্প আবারও বলেন, তিনি ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করার পরিকল্পনা করছেন। বক্তব্যটি ইঙ্গিত দেয়—ওয়াশিংটন অন্তত তাৎক্ষণিকভাবে তেহরানের পতন প্রত্যাশা করছে না।
পর্দার আড়ালে আরেকটি নামও ঘুরপাক খাচ্ছিল। ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি (Reza Pahlavi)–এর সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন। প্রশ্ন উঠেছে—সরকার পতন হলে তাঁকে সামনে আনার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না। তবে জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তারা ক্রমেই হতাশ; তাঁদের ধারণা, বাইরে থেকে সমর্থিত কোনো নেতার পক্ষে বাস্তবে ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিল (Atlantic Council)–এর সদস্য ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন প্যানিকফ (Jonathan Panikoff) বলেন, হামলা থামার পর যদি ইরানের জনগণ রাস্তায় নামে, তবে সবকিছু নির্ভর করবে নিরাপত্তা বাহিনীর সাধারণ সদস্যদের ওপর। তারা কি অস্ত্র তুলে জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, নাকি জনগণের পাশে যাবে—সেই সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
তিনি সতর্ক করে দেন, “অন্যথায় যাদের হাতে অস্ত্র আছে, শাসকগোষ্ঠীর সেই অংশ ক্ষমতা ধরে রাখতে সেই অস্ত্র ব্যবহার করতেই পারে।”
তাই খামেনির মৃত্যু যেন শেষ নয়, বরং এক অনিশ্চিত সূচনা। আকাশে বোমার শব্দ থেমে গেলেও, ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নগুলো এখনো ধোঁয়ার মতোই ভাসছে—ঘন, অস্বচ্ছ, আর অমীমাংসিত।

