ভারতের মধ্যপ্রদেশের ধার জেলায় এক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা স্থানীয় এলাকায় তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে এক নির্মম ষড়যন্ত্রের কাহিনি, যেখানে দাম্পত্য জীবনের দীর্ঘদিনের অবমাননা, ঘৃণা এবং পরকীয়ার সম্পর্কের জেরে নিজের স্বামীকেই হত্যার পরিকল্পনা করেন এক নারী।
অভিযুক্ত ওই নারীর নাম প্রিয়াঙ্কা পুরোহিত, যিনি তার স্বামী দেবকৃষ্ণ পুরোহিতকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ৭ এপ্রিল রাতে নিজ বাড়িতেই খুন হন ২৮ বছর বয়সী দেবকৃষ্ণ পুরোহিত, যিনি পেশায় একজন মসলা ব্যবসায়ী ছিলেন। ঘটনার পরপরই প্রিয়াঙ্কা পুলিশকে জানান, তাদের বাড়িতে একদল ডাকাত প্রবেশ করে প্রায় সাড়ে তিন লাখ রুপির গয়না লুট করে নিয়ে যায়। তিনি দাবি করেন, ডাকাতদের বাধা দিতে গেলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিজের নির্দোষিতা প্রমাণের জন্য তিনি আরও বলেন, ডাকাতরা তাকে বেঁধে রেখে যায় এবং ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র তছনছ করে পালিয়ে যায়।
তবে ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশের সন্দেহ হয় প্রিয়াঙ্কার বক্তব্য নিয়ে। তার বয়ানে একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়ে। এরপর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ তথাকথিত লুট হওয়া সব গয়নাই ঘরের ভেতর থেকে উদ্ধার করে। এতে পুলিশের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয় এবং প্রিয়াঙ্কাকে দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জেরার মুখে শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে আসে এক ভয়ংকর পরিকল্পনার বিস্তারিত তথ্য।
তদন্তে জানা যায়, রাজগড় এলাকার বাসিন্দা কমলেশ পুরোহিত নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রিয়াঙ্কার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। স্বামী দেবকৃষ্ণকে তাদের সম্পর্কের পথে বাধা হিসেবে দেখছিলেন তারা। তাই তাকে সরিয়ে দিতে এক লাখ রুপির বিনিময়ে সুরেন্দ্র ভাটি নামে এক ভাড়াটে খুনিকে নিয়োগ করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘটনার রাতে প্রিয়াঙ্কা ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়ির দরজা খোলা রাখেন। দেবকৃষ্ণ ঘুমিয়ে পড়ার পর সুরেন্দ্র ঘরে প্রবেশ করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এরপর ডাকাতির নাটক সাজাতে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে রেখে দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, বিয়ের পর থেকেই দেবকৃষ্ণের গায়ের রং নিয়ে নিয়মিত কটূক্তি করতেন প্রিয়াঙ্কা। এ কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই অশান্তি লেগে থাকত। দেবকৃষ্ণের বোন জ্যোতির দাবি, ২০২০ সাল থেকেই প্রিয়াঙ্কার অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে বলে তাদের সন্দেহ ছিল। প্রিয়াঙ্কা প্রায়ই বলতেন, দেবকৃষ্ণ তাকে পাওয়ার যোগ্য নন। পারিবারিক শান্তি বজায় রাখতে সবকিছু চুপচাপ সহ্য করতেন দেবকৃষ্ণ, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে প্রাণ দিতে হলো।
বর্তমানে পুলিশ প্রিয়াঙ্কা পুরোহিত ও তার প্রেমিক কমলেশ পুরোহিতকে গ্রেফতার করেছে। তবে অভিযুক্ত ভাড়াটে খুনি সুরেন্দ্র ভাটি এখনও পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে। এই ঘটনায় অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার। বিশেষ করে দেবকৃষ্ণের মা সন্তানের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন।
একটি সাজানো ডাকাতির গল্পের আড়ালে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘদিনের বিদ্বেষ, অপমান এবং অবৈধ সম্পর্কের এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্থানীয়রা বলছেন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক বিদ্বেষ কখনো কখনো কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, এই ঘটনাই তার প্রমাণ।

