বাঘাইছড়ি প্রতিনিধি:
রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলা পৌরসভার ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাচালং বাজার থেকে লাইল্যাঘোনা পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নকাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পটি “GOV Maintenance” এর আওতায় বাস্তবায়ন করছে Local Government Engineering Department (এলজিইডি)।
তথ্য অনুযায়ী, মেসার্স আয়ান এন্টারপ্রাইজ নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে কাজটি করছেন বাঘাইছড়ি প্রেসক্লাবের সভাপতি ও উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল মাবুদ এবং উপজেলা বিএনপির সদস্য আতাউর রহমান।
সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের গার্ডওয়াল নির্মাণে নিম্নমানের ইট ও বালি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অনুপাতে সিমেন্ট ব্যবহার না করে দায়সারা কাজ সম্পন্ন করার অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে। গার্ডওয়ালের ইট হাত দিয়ে টান দিলে উঠে যাচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে রাস্তার কাজ ও গার্ডওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে, যা মানসম্মত নির্মাণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কার্পেটিংয়ের ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেছে। সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী যেখানে ১৫ মিলিমিটার পুরুত্ব থাকার কথা, সেখানে বাস্তবে ৭ থেকে ৮ মিলিমিটার কার্পেটিং দেওয়া হচ্ছে।
কার্পেটিংয়ের কাজ সম্পন্ন করার তিন থেকে চার দিন পর বাঁশের কঞ্চি দিয়ে খোঁচা দিলে এবং হাত দিয়ে টান দিলেই পিচ ঢালাই উঠে যাচ্ছে, যা কাজের স্থায়িত্ব ও গুণগত মান নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। এছাড়া প্রকল্পের কাজ চলাকালীন সময়ে কোনো সতর্কতামূলক বা কর্তৃপক্ষের সাইনবোর্ড দেখা যায়নি।
এছাড়া রাস্তার ওপরের বালি ও ময়লা যথাযথভাবে অপসারণ না করেই তার ওপর বিটুমিন ঢেলে দ্রুত কাজ শেষ করার প্রমাণও পাওয়া গেছে। এতে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে সড়কটির টেকসই অবস্থা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
একজন স্থায়ী বাসিন্দা বলেন, “এভাবে কাজ হলে বর্ষায় আবার গর্ত হবে, কার্পেটিং উঠে যাবে। শেষ পর্যন্ত ভোগান্তি পোহাতে হবে সাধারণ মানুষকেই।”
এদিকে কাজ চলাকালে এলজিইডির কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীকে সরেজমিনে দেখা যায়নি। ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট কামরুলের সঙ্গে কথা বলে তার কাছেও কাজের কোনো এস্টিমেট কপি পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কাজ হচ্ছে এবং কোনো অনিয়ম নেই। তবে অভিযোগের নির্দিষ্ট বিষয়গুলো দেখানো হলে তিনি এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
ঘটনাস্থলে তৎক্ষণাৎ উপস্থিত হয়ে ঠিকাদার আব্দুল মাবুদের ভাগিনা এবং উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক নূর উদ্দিন রাজু সাংবাদিকদের উদ্দেশে উল্টো প্রশ্ন তোলেন— “এখানে কী সমস্যা হয়েছে? এটা কি আপনাদের এলাকা? আপনারা কে? আপনারা কি উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার, নাকি থানা ইঞ্জিনিয়ার?”
তিনি আরও বলেন, “এ বিষয়ে আর কথা বললে আমার চোখের পর্দা উল্টে গেলে তখন অনেক সমস্যা হয়ে যাবে।”
নূর উদ্দিন রাজু সাংবাদিকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন এবং নানাভাবে হুমকি প্রদান করেন। তিনি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ‘চাঁদাবাজি’ করতে আসার অভিযোগও তোলেন। এমনকি উপস্থিত শ্রমিকদের উদ্দেশেও ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের প্রশ্ন তুললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন।
স্থানীয়দের দাবি, সংশ্লিষ্টদের রাজনৈতিক পরিচয় ও সামাজিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে প্রভাব খাটিয়ে কাজটি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্বে থাকায় এবং সরকার দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় আব্দুল মাবুদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তোলার সাহস কেউ করে না।
বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও গত ১৭ বছর স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে নিজের ব্যবসা, ঠিকাদারি এবং সাংবাদিকতা চালিয়ে গেছেন—এমন অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে।
এমন অনিয়মের ব্যাপারে উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ বুঝে নেবে, তারপর তাদের বিল ছাড় করা হবে। আর কাজে যদি কোনো রকম অনিয়ম ধরা পড়ে তবে ঠিকাদারি লাইসেন্স কালো তালিকাভুক্ত করা হবে এবং জামানতও বাজেয়াপ্ত করা হবে।
কিন্তু উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. সাজু আহমেদ উল্টো দুর্নীতির পক্ষে কথা বলছেন এবং সাংবাদিকদের ওপর মিথ্যা অভিযোগ চাপানোর চেষ্টা করেছেন। সাজু আহমেদকে অনিয়মের বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপনি (প্রতিবেদক) পিচের ওপর ডিজেল ঢেলে খোঁচা দিয়েছেন, তাই উঠে গেছে। আপনারা আগেই ইট তুলে পরে ভিডিও করে বলছেন যে হাত দিয়ে টান দিলে ইট উঠে যাচ্ছে।”
এর প্রেক্ষিতে তাকে প্রশ্ন করা হয় যে তিনি ঠিকাদারের পক্ষ নিচ্ছেন এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় করছেন। তিনি এর কোনো সদুত্তর দেননি; বরং প্রতিবেদককে হেনস্তা করার চেষ্টা করেছেন। সবশেষে তাকে কত টাকার বিনিময়ে ঠিকাদারকে কাজটি তুলে দেবেন—এমন প্রশ্ন করলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন। পরে পুনরায় ফোন করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।
সরকারি অর্থে বাস্তবায়নাধীন একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রকল্পে এ ধরনের অনিয়মের অভিযোগ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণের ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সচেতন মহল দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, কাজের গুণগত মান যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

