ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লেও, ইয়েমেনের শক্তিশালী হুতি বিদ্রোহীরা এখনো অনেকটা রয়ে-সয়ে অবস্থান করছে।
আধুনিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে দক্ষ এই গোষ্ঠীটি যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখলেও তাদের বর্তমান ‘কৌশলগত নীরবতা’ নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
হুতিরা মূলত উত্তর ইয়েমেনভিত্তিক শিয়া ইসলামের ‘জায়েদি’ মতাদর্শী একটি গোষ্ঠী। ২০১১ সালের আরব বসন্তের পর তারা ইয়েমেনে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে এবং ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এরপর ২০১৫ সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ে তারা ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে সৌদি ও আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়ে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে।
২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরু হলে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে লোহিত সাগরে ইসরায়েল ও পশ্চিমা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছিল হুতিরা। তবে ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর তারা হামলা বন্ধ করে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় হুতি নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি হুশিয়ারি দিয়েছেন যে, প্রয়োজনে তাদের আঙুল যেকোনো মুহূর্তে ‘ট্রিগারে’ নামতে প্রস্তুত। বিশ্লেষকরা হুতিদের এই যুদ্ধের বাইরে থাকার পেছনে কয়েকটি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন:
স্বতন্ত্র এজেন্ডা: হিজবুল্লাহ বা ইরাকি গোষ্ঠীগুলো ধর্মীয়ভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে যেভাবে অনুসরণ করে, হুতিরা ঠিক সেভাবে করে না। তাদের তৎপরতা মূলত ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ দ্বারা চালিত।
অভ্যন্তরীণ সংকট: দীর্ঘদিনের যুদ্ধে ইয়েমেনে ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট চলছে। নতুন করে বড় কোনো যুদ্ধে জড়ালে ইয়েমেনের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুরোপুরি ধসে পড়তে পারে।
অনেকে মনে করছেন, হুতিরা মোক্ষম সময়ের অপেক্ষায় আছে। যদি হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং লোহিত সাগরের গুরুত্ব বেড়ে যায়, তবে তারা সেই সুযোগে সর্বোচ্চ চাপ তৈরি করতে পারে।
সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এমনকি সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বড় ধরনের আকাশ হামলার ঝুঁকি রয়েছে, যা হুতিদের বর্তমান স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।
হুতিরা মূলত ‘অপ্রত্যাশিত’ পদক্ষেপের জন্য পরিচিত। তারা যদি যুদ্ধে নামার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে লোহিত সাগর ও আরব উপদ্বীপের নৌ চলাচলে তারা বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাতে পারে। বর্তমানে তারা ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে এমন এক পরিস্থিতির অপেক্ষা করছে যখন তাদের আঘাত সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে।
আপাতত হুতিদের ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ নীতি মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতকে আরও রহস্যময় ও অনিশ্চিত করে তুলছে।

