মধ্যপ্রাচ্যের পাহাড়ি সীমান্ত অঞ্চল—যেখানে ইরান, ইরাক, তুরস্ক ও সিরিয়ার সীমান্ত মিলেছে—সেই অঞ্চল বহু দশক ধরে কুর্দি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সংগ্রামের সাক্ষী। এই সংগ্রামেরই নতুন এক অধ্যায়ের ইঙ্গিত মিলছে ইরাকের উত্তরাঞ্চল থেকে।
ইরানে শাসকবিরোধী কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর নেতারা সম্প্রতি বিবিসিকে জানিয়েছেন, তারা সীমান্ত পার হয়ে ইরানে প্রবেশের পরিকল্পনা করছে। যদিও তারা পরিষ্কার করে বলেছে—এই পরিকল্পনা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি এবং তাদের কোনো যোদ্ধা এখনো ইরানি ভূখণ্ডে প্রবেশ করেনি।
ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থান করা কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টির একজন নেতা হানা ইয়াজদানবানা বিবিসি সংবাদদাতা অর্লা গেরিনকে বলেন, এই পরিকল্পনা নতুন কিছু নয়। বরং ইসলামিক রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ৪৭ বছর ধরে এর প্রস্তুতি চলছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এখনো পর্যন্ত একটি যোদ্ধাও অগ্রসর হয়নি। তার ভাষায়, “আমরা তাদের কথা বলছি যারা মৃত্যুর মুখোমুখি হয়।”
ইয়াজদানবানা জানান, সম্প্রতি ছয়টি কুর্দি বিরোধী সংগঠন একত্র হয়ে “ইরানিয়ান কুর্দিস্তানের রাজনৈতিক শক্তির জোট” নামে একটি রাজনৈতিক ও সামরিক জোট গঠন করেছে। এই জোটের উদ্দেশ্য হলো ইরানি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের কার্যক্রম সমন্বয় করা। তিনি বলেন, “কেউ একা কাজ করছে না। আমাদের ভাইয়েরা পদক্ষেপ নিলে আমরা তা জানতে পারব।” তবে তার মতে, খুব দ্রুত কোনো অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের আগে আকাশপথের পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।
ইয়াজদানবানা বলেন, “আমাদের ওপরে আকাশসীমা পরিষ্কার না হলে আমরা অগ্রসর হতে পারি না। আমাদের অবশ্যই ইরানি শাসনব্যবস্থার অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস করতে হবে—নইলে সেটা আত্মঘাতী প্রচেষ্টা হবে। এই শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত নৃশংস, আর আমাদের সবচেয়ে উন্নত অস্ত্র হলো কালাশনিকভ রাইফেল।”
মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চলে প্রায় আড়াই থেকে সাড়ে তিন কোটি কুর্দি জনগোষ্ঠীর বসবাস। তারা তুরস্ক, ইরাক, সিরিয়া, ইরান এবং আর্মেনিয়ার সীমান্তজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। সংখ্যায় তারা মধ্যপ্রাচ্যের চতুর্থ বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী হলেও কখনোই স্থায়ী স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ইরানের প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশই কুর্দি, যাদের বেশিরভাগই সুন্নি মুসলিম। তারা মূলত দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বসবাস করে।
মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, ইরানের কুর্দিরা দীর্ঘদিন ধরে গভীর বৈষম্যের শিকার। তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার দমন করা হয়েছে এবং অর্থনৈতিক সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাসিত কুর্দি বিরোধী গোষ্ঠীগুলো ইরাকের কুর্দিস্তানে ঘাঁটি গড়ে বহু বছর ধরে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে মাঝে মাঝে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে।
২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি “ইরানি কুর্দিস্তানের রাজনৈতিক শক্তির জোট” গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এই জোটে ছয়টি সংগঠন যুক্ত হয়েছে—কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টি, কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ইরান, কুর্দিস্তান ফ্রি লাইফ পার্টি, কুর্দিস্তান স্ট্রাগল অর্গানাইজেশন অব ইরান ‘খাবাত’, কুর্দিস্তানের শ্রমিকদের কমালা এবং পরে কমালা পার্টি অব ইরানিয়ান কুর্দিস্তান। এই জোট গঠনের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সময়ও কাজ করেছে। কুর্দি নেতারা মনে করেন, ইরানের শাসনব্যবস্থার বৈধতা দুর্বল হচ্ছে এবং বিরোধী শক্তিগুলো বিভক্ত অবস্থায় রয়েছে। তাই ঐক্যবদ্ধ হলে তারা সংগ্রামে আরও শক্তিশালী হতে পারবে। তবে জোট গঠনের কয়েক দিনের মধ্যেই বাস্তবতা তাদের সামনে হাজির হয়। তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর ওপর হামলা চালায় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী। এই পরিস্থিতিতে জোটটি ইরানের ভেতরে কুর্দি অঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সরকার ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানায়। তাদের মতে, ইরান বর্তমানে গভীর ও মৌলিক রূপান্তরের পথে এগোচ্ছে। তবে এই জোট গঠন ইরাকের কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কারণ এসব সংগঠনের বেশিরভাগই ওই অঞ্চলে সক্রিয়।
আঞ্চলিক সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কার্যক্রম চালাতে দেবে না। অন্যদিকে, এই উদ্যোগ কিছু আঞ্চলিক শক্তির সমর্থনও পেয়েছে। আহওয়াজি ডেমোক্রেটিক পপুলার ফ্রন্ট জোট গঠনকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এটি ইরানে পারসিয়ান নয় এমন জাতিগোষ্ঠীগুলোর বৃহত্তর অধিকারের সংগ্রামের অংশ। সিরিয়ার ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন পার্টিও এটিকে কুর্দি ঐক্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
তবে সবাই এই জোটকে সমর্থন করেনি। ইরানের শেষ শাহ-এর নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভি অভিযোগ করেছেন, এই জোটের বক্তব্য ইরানের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। তিনি বলেন, দেশের জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না। এর জবাবে কুর্দি জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী নয়। বরং তাদের লক্ষ্য ইরানের ভেতরে গণতান্ত্রিক কাঠামোর অধীনে কুর্দিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
এদিকে বিবিসি মনিটরিং ইউনিটের কিছু রিপোর্টে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি ইরানের ভেতরে বিদ্রোহ উসকে দিতে কিছু কুর্দি বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ করছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ইরানের নেতা মুস্তাফা হিজরির সঙ্গে যোগাযোগও করেছেন। যদিও এই তথ্যের কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ নেই, তবে এটি ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহের মাত্রা স্পষ্ট করে। বহু বছরের বিভক্তির পর কুর্দি সংগঠনগুলোর এই নতুন জোট একদিকে তাদের ঐক্যের প্রতীক, অন্যদিকে ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাব্য এক নতুন অধ্যায়েরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে শেষ পর্যন্ত এই জোটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর—ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পরিবর্তন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অবস্থান এবং সবচেয়ে বড় কথা, কুর্দি দলগুলোর নিজেদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখার সক্ষমতার ওপর।

