ভেনেজুয়েলার বামপন্থী রাজনীতির প্রতীক হুগো শ্যাভেজের হাত ধরেই রাজনীতির মূল স্রোতে প্রবেশ করেন নিকোলাস মাদুরো। একসময় যিনি বাস চালাতেন, ছিলেন একজন শ্রমিক নেতা—সেই মাদুরোই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন লাতিন আমেরিকার অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত রাষ্ট্রনায়ক।
শ্যাভেজ সরকারের সময় প্রথমে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান মাদুরো। পরে তাকে করা হয় ভাইস প্রেসিডেন্ট। শ্যাভেজের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে তাকেই উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করা হয় এবং সে বছরই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন তিনি।
ক্ষমতায় আসার পর নিজেকে ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারক ও বাহক হিসেবে উপস্থাপন করেন মাদুরো। যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য ও অবস্থানের কারণে দ্রুতই ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে এই বিরোধ বন্ধুত্বের সম্ভাবনা ছাড়িয়ে প্রকাশ্য শত্রুতায় রূপ নেয়। আটলান্টিকের পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাদুরো হয়ে ওঠেন এক বড় ‘মাথাব্যথা’। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি আমলে তিনি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আক্রমণের কেন্দ্রে চলে আসেন।
মাদুরোর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র তার সরকারকে উৎখাত করতে ধারাবাহিকভাবে অভ্যুত্থানচেষ্টা, অর্থনৈতিক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিচ্ছে। তবে পশ্চিমা দেশগুলো এবং ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো তার বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েম, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা এবং নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলেছে। মাদুরো এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন।
২০১৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেন মাদুরো। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে ভেনেজুয়েলার আইন পরিষদ সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে মাদুরো জোরপূর্বক ক্ষমতা আঁকড়ে রাখেন। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশ তাকে ভেনেজুয়েলার বৈধ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও মাদুরো ক্ষমতায় টিকে থাকেন। বিরোধীদের দাবি ছিল, তাদের প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেজ বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। তবে নির্বাচন কমিশন মাদুরোকেই বিজয়ী ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশ এই ফল প্রত্যাখ্যান করে গঞ্জালেজকে ‘নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু সেনাবাহিনী ও পুলিশের পূর্ণ সমর্থন মাদুরোর হাতে থাকায় তিনি ক্ষমতা ছাড়েননি। অপরদিকে গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় গঞ্জালেজ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
ওয়াশিংটনের অভিযোগ আরও গুরুতর। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, মাদুরো সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে দেশের কারাগার ও মানসিক হাসপাতাল থেকে অপরাধীদের মুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাচ্ছে। পাশাপাশি মাদক পাচারও বড় ইস্যু। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফেন্টানিল ও কোকেনের প্রবাহ ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন এবং ভেনেজুয়েলার দুটি অপরাধী সংগঠনকে ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণা করেছেন। ট্রাম্পের দাবি, এর একটির নেতৃত্বে রয়েছেন স্বয়ং মাদুরো।
তবে মাদুরো এসব অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “মাদকবিরোধী যুদ্ধের নামে যুক্তরাষ্ট্র আসলে আমাকে সরিয়ে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ দখল করতে চায়।”
বাসচালক থেকে রাষ্ট্রপতি—নিকোলাস মাদুরোর এই রাজনৈতিক যাত্রা যেমন বিস্ময়কর, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব ভেনেজুয়েলাকে টেনে এনেছে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির এক বিপজ্জনক কেন্দ্রবিন্দুতে।

