রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানি করে—এমন দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত বিল ভারতের জন্য নতুন কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ‘রাশিয়ান স্যাংশনস বিল’ নামে পরিচিত এই প্রস্তাবটি অনুমোদন পেয়েছে, যদিও এখনো চূড়ান্ত ভোটাভুটি হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, বিলটি পাস হলে ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র চাপ বাড়াতে পারবে, যাতে তারা রাশিয়া থেকে তুলনামূলক সস্তা তেল কেনা বন্ধ করে। এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র–ভারত বাণিজ্য চুক্তি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন না করায় চুক্তিটি এগোয়নি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তাকে থামাতে পারে কেবল তার ‘নিজস্ব নীতি’ ও ‘নিজস্ব মন’। এ নিয়ে ভারতে প্রশ্ন উঠেছে—মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের কি কোনো বাস্তব সীমা আছে?
গত বছর আগস্টে শুল্ক বৃদ্ধির হুমকির জবাবে ভারত বলেছিল, রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের সমালোচনা করলেও তারাও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমিয়েছে। তবুও প্রস্তাবিত বিল কার্যকর হলে ভারতকে হয় রাশিয়ার তেল পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে, নয়তো ৫০০ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়তে হবে।
গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, এ ধরনের শুল্ক আরোপ হলে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে ঝুঁকিতে পড়বে প্রায় ৮৭.৪ বিলিয়ন ডলারের ভারতীয় রপ্তানি। তিনি মনে করেন, বিলটি কংগ্রেসে পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও ভারতের উচিত নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে ভারতের রাশিয়ান তেল আমদানি বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামতে পারে। ব্লুমবার্গ জানায়, জুনে দৈনিক ২.১ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে ডিসেম্বরে ভারতের রাশিয়া থেকে তেল আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। অথচ ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি ছিল ৮৭.৪ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
এদিকে দ্য ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিলটির বাস্তব লক্ষ্য ভারত হলেও চীন অনেকটাই এর বাইরে থাকতে পারে। অন্যদিকে রয়টার্স জানিয়েছে, ভারত সরকার চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর থাকা পাঁচ বছরের পুরোনো টেন্ডার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে—যা নিয়ে বিরোধী দল কংগ্রেস সমালোচনা করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিল পাস হলে ভারত–মার্কিন সম্পর্ক আরও চাপে পড়বে। অনন্ত সেন্টারের সিইও ইন্দ্রাণী বাগচী বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত হিসাবের অংশ হিসেবেই এই বিল সামনে আনা হয়েছে। তার মতে, শুল্ক কার্যকর হলেও বিশ্ব তেলের বাজার স্থিতিশীল থাকায় ভারত বা রাশিয়া বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে না।
তবে গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ সতর্ক করে বলেছে, ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের আমদানিও কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যার পরিমাণ বর্তমানে বছরে ১২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

