আমিনুল ইসলাম
হরমুজ প্রণালি—যা বিশ্বের জ্বালানি তেলের ধমনী হিসেবে পরিচিত—সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ‘ব্লকেড’ বা অবরোধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে চীনকে তেল কেনা থেকে বিরত রাখার কৌশল হলেও, বিশেষজ্ঞরা একে খোদ আমেরিকার জন্যই একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।
অবরোধের নেপথ্যে ও বর্তমান পরিস্থিতি
প্রাথমিকভাবে সমস্ত জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞার কথা বললেও, ট্রাম্প প্রশাসন এখন শুধু ইরানগামী বা ইরান থেকে আসা জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। এর মূল উদ্দেশ্য ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করা। তবে এই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন সামরিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিশাল ব্যয়ভার: ব্রিটিশ সামরিক বিশেষজ্ঞ শন বেলের মতে, হরমুজে যে পরিমাণ নৌবহর আমেরিকা মোতায়েন করেছে, তার পেছনে প্রতিদিন কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। ইরান কেবল নিজের সীমানায় ‘চুপচাপ’ বসে থাকলেই আমেরিকার এই বিশাল আর্থিক ক্ষতি অব্যাহত থাকবে।
ইরানের বিকল্প পথ: তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারান্ডির তথ্যমতে, ইরান খাদ্য উৎপাদনে ৮০ শতাংশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। এছাড়া ইরাক, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং বিশেষ করে রাশিয়ার বন্ধুপ্রতিম দেশ তুর্কমেনিস্তানের সাথে স্থল সীমান্ত থাকায় ইরান পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়া অসম্ভব।
ট্রাম্পের দুশ্চিন্তা: বাজার ও তেলের দাম
অধ্যাপক জন মেয়ারসেইমারের মতে, ট্রাম্প সবসময় শেয়ার বাজার এবং তেলের দাম নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। অতীতে তিনি যখন ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছিলেন, তার মূল কারণ ছিল বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।
কিন্তু বর্তমান অবরোধের ফলে ইউরোপ ও আমেরিকায় তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে।
ভোক্তা পর্যায়ে এখনই প্রভাব না পড়লেও, দুই-তিন মাস আগের রিজার্ভ শেষ হওয়ার পর বিশ্ব অর্থনীতি এক ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে।
সিএনএন-এর স্টিফ্যান কলিংসের মতে, এই ব্লকেড বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি ‘মারাত্মক আঘাত’।
আন্তর্জাতিক মিত্রদের অনীহা ও ন্যাটোর ভবিষ্যৎ
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও পাশে নেই। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেইর স্টার্মার স্পষ্ট জানিয়েছেন, ব্রিটেন এই অবরোধে অংশ নেবে না। তুরস্কের কড়া অবস্থান এবং ন্যাটোর ভেতরে অস্থিরতা নির্দেশ করছে যে, আমেরিকা কার্যত একঘরে হয়ে পড়ছে। বিশ্লেষক মাইকেল ক্লার্কের মতে, আমেরিকা যদি ন্যাটো থেকে বের হয়ে যায়, তবে তুরস্ক বা অন্য আরব দেশগুলো পরবর্তী টার্গেটে পরিণত হতে পারে।
মতামত: কে জিতবে এই ‘অবরোধ’ খেলায়?
ইরান শুরু থেকেই চেয়েছিল হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করতে, যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আমেরিকাকে যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করে। ট্রাম্পের বর্তমান অবরোধ ইরানের সেই কাজটিকে আরও সহজ করে দিয়েছে।
দ্য আর্ট অব ওয়ার-এর সেই বিখ্যাত উক্তি—”You can win all the battles, still lose the war”—এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ভিয়েতনামের মতো ইরান যুদ্ধেও আমেরিকা সামরিক শক্তিতে অনেক এগিয়ে থাকলেও, দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক জনমত ট্রাম্পের প্রতিকূলে যাচ্ছে। ইরান যদি কেবল নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে, তবে শেষ পর্যন্ত জয় তাদেরই হবে। কারণ, বিশ্ব নেতারা যখন তেলের জন্য হাহাকার শুরু করবেন, তখন ট্রাম্পের ফোনে আসা অবিরাম কলগুলোই তাকে পিছু হটতে বাধ্য করবে।
আমেরিকা এখন ইরানে আটকে গেছে; আর এই গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়া ট্রাম্পের জন্য সহজ হবে না।
আপনার বিশ্লেষণের সারসংক্ষেপ: আপনি অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে দেখিয়েছেন যে, সামরিক শক্তি দিয়ে লড়াই জেতা গেলেও অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধের সমীকরণ সম্পূর্ণ আলাদা। ইরান তাদের ভৌগোলিক সুবিধা এবং দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির কারণে এই প্রতিকূলতা সইতে পারলেও, বিশ্ব বাজার সম্ভবত ট্রাম্পের এই পরীক্ষামূলক অবরোধের ধকল সইতে পারবে না।

