নুরী আক্তার মুন, ডেস্ক রিপোর্ট :
পুরো এক মাসের রোজার সাধনার পর যখন শেষ বিকেলের আকাশে দেখা মেলে এক চিলতে বাঁকা চাঁদ, তখন চারদিকে ছড়িয়ে যায় আনন্দের হিল্লোল। কেউ একে বলেন ‘রোজার ঈদ’, কেউ বা ‘সেমাই ঈদ’। কিন্তু এই আনন্দের উৎসবটি বিশ্বের একেক প্রান্তে একেক নামে এবং একেক ঢঙে পালন করা হয়।
ইতিহাসের পাতা থেকে ঈদ
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, প্রথম ঈদুল ফিতর পালিত হয়েছিল ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে বদর যুদ্ধের পর। তবে ইতিহাস শুধু এখানেই থেমে নেই। ১৮০৫ সালে আমেরিকার হোয়াইট হাউসে প্রথম ইফতারের আয়োজন করেছিলেন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন। ১৯৯৬ সালে হিলারি ক্লিনটন হোয়াইট হাউসে ঈদের ডিনার পার্টির আয়োজন করে নতুন ইতিহাস গড়ে দেন।
আরবিতে ‘ঈদ’ মানে উৎসব, আর ‘ঈদুল ফিতর’ মানে রোজা ভাঙার উৎসব। একে ‘ঈদুল সগিরা’ বা ছোট ঈদও বলা হয়। তবে নামের বৈচিত্র্যও রয়েছে।
মালয়েশিয়ায়: হরি রায়া পুয়াসা
ইন্দোনেশিয়ায়: লেবারন
তুরস্কে: সেকারু বাইরামী (মিষ্টি উৎসব)
ভারত ও শ্রীলঙ্কায় তামিল ভাষায়: নোনপু পেরুনাল
নাম ভিন্ন হলেও আনন্দের সুর সবখানেই একই।
বিচিত্র ঈদের গল্প
আফগানিস্তান: ছোট-বড় সবাই ‘তোখম জাঙ্গী’ বা ডিম লড়াই খেলে। দুজন দুটি সেদ্ধ ডিম নিয়ে একে অপরের ডিমে আঘাত করে। যার ডিম আস্ত থাকে, সে হয় বিজয়ী।
ইন্দোনেশিয়া: ‘মুদিক’ নামে একটি প্রথা আছে। প্রায় অর্ধেক শহরবাসী ঈদের আগে গ্রামে ফিরে যান, যার ফলে বিশাল ট্রাফিক জ্যাম তৈরি হয়।
তুরস্ক: শত বছর আগে সুলতানরা ‘কা-আখ’ নামক বিস্কুট বিলি করতেন। কিছু বিস্কুটে লুকানো থাকতো আসল সোনা। ভাগ্যবান যিনি পেতেন, তার ঈদ হয়ে যেত ডাবল খুশি!
বাংলাদেশে ঈদ মানেই খাবারের ধুম
উত্তরের বগুড়ায় জনপ্রিয় চিকন সেমাই, নরসিংদীতে হাতে তৈরি সেয়ই সেমাই, চট্টগ্রামে চালের রুটি ও গরুর মাংসের ঐতিহ্যবাহী জুটি, আর সিলেটে পাওয়া যায় কড়কড়ে কড়ই পিঠা। খাবারেই ঈদের আনন্দ পূর্ণতা পায়।
ঈদুল আজহার ঐতিহ্য
শুধু ঈদুল ফিতর নয়, ঈদুল আজহার আত্মত্যাগের দিনও মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব রাখে। আন্দালুসিয়া থেকে মোগল ভারত—সবখানেই ঈদের দিন ছিল সাজসজ্জা, দানশীলতা ও সম্প্রীতির প্রতীক। মোগল সম্রাটরা হাতির পিঠে চড়ে মিছিলে বের হতেন, যেখানে হিন্দু-মুসলিম সবাই একসাথে আনন্দ ভাগ করে নিত।
বিশ্বের নানা প্রান্তে বিভিন্ন রীতিনীতি, মজার খেলা এবং খাবারের বৈচিত্র্য ঈদকে করে তুলেছে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এক বিস্ময়কর সাংস্কৃতিক মিলনের প্রতীক।

