সত্যজিৎ দাস:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের গোপন সামরিক গবেষণা ইউনিট Unit 731 মানব ইতিহাসের সবচেয়ে অমানবিক পরীক্ষাগুলোর একটি পরিচালনা করেছিল। কিন্তু যুদ্ধ শেষে এই ইউনিটের বহু বিজ্ঞানী বিচার এড়িয়ে যান। কারণ,তাদের গবেষণার তথ্যের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে তাদের সুরক্ষা দেয় বলে ইতিহাসবিদদের অনেকেই মনে করেন।
১৯৩০-এর দশকে জাপানি অধিকৃত চীনের Harbin শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউনিট ৭৩১। এর নেতৃত্বে ছিলেন জাপানি সেনা কর্মকর্তা ও চিকিৎসা গবেষক Shirō Ishii। এই ইউনিট মূলত জৈবিক ও রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির গোপন গবেষণাগার হিসেবে পরিচালিত হতো।
এখানে হাজার হাজার যুদ্ধবন্দী ও সাধারণ মানুষের ওপর ভয়াবহ পরীক্ষা চালানো হয়। বন্দীদের মানুষ হিসেবে নয়,বরং “মারুতা” বা “কাঠের গুঁড়ি” বলে উল্লেখ করা হতো। তাদের শরীরে অ্যানথ্রাক্স,প্লেগ,কলেরা ও টাইফয়েডসহ বিভিন্ন মারাত্মক জীবাণু প্রবেশ করিয়ে দেখা হতো শরীর কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়।
অনেক ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অ্যানেস্থেসিয়া ছাড়াই জীবন্ত মানুষের শরীর কেটে অভ্যন্তরীণ অঙ্গ পরীক্ষা করা হতো। এছাড়া উচ্চচাপ,তীব্র ঠান্ডা কিংবা রক্তক্ষরণের মতো পরিস্থিতিতে মানুষের শরীর কতক্ষণ টিকে থাকতে পারে, তাও পরীক্ষা করা হয়। গবেষণার অংশ হিসেবে প্লেগে আক্রান্ত মাছি চীনের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল,যার ফলে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে।
১৯৪৫ সালে জাপানের পরাজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র জাপানে প্রবেশ করে। তখন তারা জানতে পারে যে ইউনিট ৭৩১ বহু বছর ধরে জৈবিক অস্ত্র নিয়ে বিপুল পরিমাণ গবেষণা তথ্য সংগ্রহ করেছে।
ইতিহাসবিদদের মতে,যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষ এই তথ্যকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। সেই সময় জাপানে মিত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন Douglas MacArthur। তার প্রশাসনের সময় ইউনিট ৭৩১-এর বিজ্ঞানীদের সঙ্গে একটি গোপন সমঝোতা হয় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সমঝোতা অনুযায়ী,বিজ্ঞানীরা যদি তাদের গবেষণার নথি,নমুনা ও তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেন,তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলা না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ফলে ১৯৪৬ সালের Tokyo War Crimes Tribunal-এ ইউনিট ৭৩১-এর নৃশংস কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়নি এবং অধিকাংশ বিজ্ঞানী বিচার এড়িয়ে যান।
যুদ্ধের পরপরই বিশ্ব রাজনীতিতে শুরু হয় Cold War। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা ছিল, যদি এই গবেষণার তথ্য সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে চলে যায়,তাহলে তারা জৈবিক অস্ত্র গবেষণায় এগিয়ে যেতে পারে।
এই কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইউনিট ৭৩১-এর তথ্য সংগ্রহ করে নিজেদের জৈবিক অস্ত্র কর্মসূচি উন্নত করতে ব্যবহার করে বলে গবেষকদের ধারণা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের Fort Detrick-এ পরিচালিত জৈবিক অস্ত্র গবেষণায় এসব তথ্য কাজে লাগানো হয়েছিল বলে অনেক ঐতিহাসিক দাবি করেন।
চুক্তির ফলে ইউনিট ৭৩১-এর বহু সদস্য পরবর্তী সময়ে জাপানে স্বাভাবিক জীবন শুরু করেন। কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক,সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কিংবা বড় ওষুধ কোম্পানির নির্বাহী পদে কাজ করেন। উদাহরণ হিসেবে Green Cross Corporation-এর মতো প্রতিষ্ঠানে তাদের উপস্থিতির কথা গবেষণায় উঠে এসেছে।
দীর্ঘ সময় জাপানে এই ইউনিটের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা সীমিত ছিল। তবে পরবর্তী দশকগুলোতে বিভিন্ন গবেষণা,বই ও তথ্যচিত্র প্রকাশের মাধ্যমে ইউনিট ৭৩১-এর ইতিহাস ধীরে ধীরে সামনে আসে।
ইউনিট ৭৩১-এর ঘটনাকে অনেক ইতিহাসবিদ রাজনৈতিক বাস্তবতা ও নৈতিকতার সংঘর্ষের উদাহরণ হিসেবে দেখেন। একদিকে মানবতার বিরুদ্ধে ভয়াবহ অপরাধ,অন্যদিকে সামরিক ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের কৌশলগত গুরুত্ব।
ফলে যুদ্ধ শেষে বিচার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি অনেকাংশে আড়ালে পড়ে যায়। এই ঘটনাকে এখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বিতর্কিত রাজনৈতিক সমঝোতাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

