সাজ্জাদ হোসেন, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি :
প্রকৃতপক্ষে টাঙ্গাইল শাড়ি জেলার গর্বের বস্তু ও কদর দেশ জোড়া। এক সময় বাংলাদেশের খ্যাতি ও গৌরব ছিল মসলিন এবং জামদানিরজন্য। তন্মধ্যে জামদানি টিকে থাকলেও মসলিন শুধু এখন ইতিহাসের সামগ্রী।
তবে মসলিন ও জামদানির পর বাংলাদেশের বস্ত্র খাতে টাঙ্গাইল শাড়ি নতুনমাত্রা যোগ করতে সক্ষম হয়েছে। টাঙ্গাইল শাড়ির নক্সা, বুনন ও রঙের ক্ষেত্রে রয়েছে ব্যাপক বৈচিত্র্য। টাঙ্গাইল শাড়ি আজ দেশের সীমানা পেরিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এমনকি ইউরোপ, আমেরিকা এবং জাপানেও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এবং করছে। উৎপাদনের সাথে জড়িত শ্রমিক তাঁতিদের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী টাঙ্গাইল জেলার ১২টি থানার মোট ৩৪,৬৭৮টি তাঁতে বর্তমানে প্রায় ৭৬ হাজার তাঁতি টাঙ্গাইল শাড়ি উৎপাদনের কাজে জড়িত রয়েছে। উল্লেখিত তাঁতের মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার তাঁত বন্ধ রয়েছে।
টাঙ্গাইল শাড়ির সাথে সংশ্লিষ্ট তাঁতিগণের প্রায় কারোরই কোন পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই। তা সত্ত্বেও শাড়ির বুননের ক্ষেত্রে এদের দক্ষতা ও নৈপূণ্য রীতিমতো বিস্ময়কর। টাঙ্গাইল শাড়ির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এর সুষ্ঠু বিপণন ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। বাজারে এ-শাড়ির যথেষ্ট চাহিদা থাকলেও বিপণন ব্যবস্থাটি মহাজনি চক্রের হাতে বন্দি।
মসলিনের প্রায় সমতুল্য সূক্ষ্ম ও উন্নত ধরণের শাড়ি এখনও টাঙ্গাইলের শিল্পীরা তৈরি করতে পারেন। টাঙ্গাইলের হিন্দু তাঁতিদের মৌলিক উপাধি বসাক। বাজিতপুর, নলশোধা, পাথরাইল গ্রামে এরা সংখ্যাধিক্য। কালিহাতীর বল্লা, রতনগঞ্জ মুসলিম কারিগর সংখ্যায় সহস্রাধিক। স্বাধীনতার পর ইদানীং টাঙ্গাইল শাড়ি তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেয়েছে।
এক সময় শোনা যায় টাঙ্গাইলে মসলিন শাড়িও তৈরি হতো। মসলিন নামে উৎপত্তি নিয়ে মতদ্ধৈতা আছে। কারো কারো মতে ‘মসলি পত্তন’ থেকে বিদেশী বণিকগণ ইউরোপে এ-বস্ত্র চালান দিত বলে এর নাম করা হয় মসলিন। খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীতে হামদ বা পর্তুগিজ জলদস্যুদের অত্যাচারে বঙ্গোপসাগর দিয়ে বিদেশে এখানকার বস্ত্র চালানোর অসুবিধার দরুন তুরস্কের তদানীন্তন রাজধানী ‘মোসলে’ নগরের তন্তুবায় সম্প্রদায় এখানকার বস্ত্র-শিল্পের অনুকরণে এক প্রকার কাপড় তৈরি করে এবং সেই ‘মোসলে’ নাম থেকেই ‘মসলিন’ নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে অনেকের বিশ্বাস। ধ্বংসের তান্ডবলীলায় মসলিন আজ অবলুপ্ত হয়েছে।
টাঙ্গাইল শাড়ি ছাড়া টাঙ্গাইলের বিভিন্ন গ্রামে যেমন, আদি টাঙ্গাইল, পাথরাইল, নলশোধা, আকদ, ঘারিন্দা, ছাতিহাটি, গোলরা, রামপুরা, জোয়াইর, মোমিননগর, করটিয়া প্রভৃতি এলাকায় মোটা বস্ত্র তৈরি হয়। এ-সব কাপড়ের রং পাকা এবং মজবুত। শাড়ি ছাড়াও টাঙ্গাইলের লুঙ্গি, গামছা ইত্যাদি তৈরি হয়।
টাঙ্গাইল জেলার কুটির শিল্প বলতে বর্তমানে তন্তুবায়ীদের বোঝায়; যারা হিন্দু সম্প্রদায়ের তাদেরকে তাঁতি এবং যারা মুসলিম সম্প্রদায়ভূক্ত তাদের জোলা বা কারিগর বলা হয়ে থাকে।

