চলুন ইতিহাসের ধুলোমাখা করিডোরে একটু পা ফেলি—যেখানে ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওঠা শুধু একজন মানুষের গল্প নয়, কখনও কখনও তা হয়ে ওঠে পুরো এক পরিবারের মহাকাব্য। রাজনীতির মঞ্চে এখানে রক্তের সম্পর্ক মিশে যায় রাষ্ট্রের দায়িত্বের সঙ্গে; বাবার অসমাপ্ত স্বপ্ন তুলে নেয় মেয়ে, মায়ের লড়াইকে এগিয়ে নেয় ছেলে। পতাকা বদলায়, সময় বদলায়, কিন্তু একই পদবি বারবার ফিরে আসে ক্ষমতার চূড়ায়।
কখনও বিপ্লব, কখনও নির্বাচন, কখনও ট্র্যাজেডি—ইতিহাসের নাট্যমঞ্চে এই পরিবারগুলো রেখে গেছে গভীর ছাপ। আজ আমরা ঘুরে দেখব সেই সব কাহিনি, যেখানে রাজনীতি কেবল নেতৃত্বের নয়, উত্তরাধিকারও।
বাংলাদেশে জিয়া পরিবার
বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে একসময় উদিত হন জিয়াউর রহমান। সামরিক কর্মকর্তা থেকে রাষ্ট্রপতি—তার উত্থান ছিল নাটকীয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দেশের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে।
স্বামীর মৃত্যুর পর ঘরোয়া জীবনের আড়াল ভেঙে রাজনীতির ময়দানে নামেন খালেদা জিয়া। আন্দোলন, নির্বাচন, নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নেন।
এরপর আসে নতুন অধ্যায়। ছেলে তারেক রহমান দলীয় নেতৃত্ব নিয়ে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। বাবা-মায়ের পথ ধরে তিনিও রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছান—একই পরিবারে তিন নেতা, এক বিরল অধ্যায়।
ভারতে নেহরু–গান্ধী পরিবার
১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন জওহরলাল নেহরু। আধুনিক ভারতের ভিত্তি রচনায় তাঁর ভূমিকা ছিল গভীর।
তারপর তাঁর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী—দৃঢ়, বিতর্কিত, তবু প্রভাবশালী। জরুরি অবস্থা থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভূমিকা—তিনি ছিলেন শক্ত হাতে দেশ চালানো এক নেত্রী।
মায়ের মৃত্যুর দিনই শপথ নেন ছেলে রাজীব গান্ধী। তরুণ বয়সে প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ভারতের স্বপ্ন দেখান। তিন প্রজন্ম, তিন প্রধানমন্ত্রী—ভারতের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক পরিবার।
পাকিস্তানে ভুট্টো–জারদারি পরিবার
পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক সময় উজ্জ্বল নাম ছিল জুলফিকার আলী ভুট্টো। তিনি নতুন সংবিধান দেন, কিন্তু সামরিক শাসনের ফাঁসিতে ঝুলে জীবন শেষ হয় তাঁর।
এরপর নেতৃত্বে আসেন কন্যা বেনজির ভুট্টো—মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। জনসমর্থন আর রাজনৈতিক নাটকীয়তায় ভরা ছিল তাঁর জীবন।
তাঁর মৃত্যুর পর স্বামী আসিফ আলী জারদারি রাষ্ট্রপতি হন। এভাবেই এক পরিবারের তিন সদস্য রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের আসনে বসেন।
শ্রীলঙ্কায় বন্দরানায়েকে পরিবার
শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে এস ডব্লিউ আর ডি বন্দরনায়েকে ছিলেন এক জাতীয়তাবাদী নেতা। হত্যাকাণ্ডে তাঁর জীবনাবসান হলেও রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হয়নি।
স্ত্রী সিরিমাভো বন্দরনায়েকে বিশ্বে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
তাঁদের মেয়ে চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী—দুই পদেই দায়িত্ব পালন করেন। এক পরিবারে মা প্রধানমন্ত্রী, মেয়ে রাষ্ট্রপতি—বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল দৃশ্য।
থাইল্যান্ডে সিনাওয়াত্রা পরিবার
থাইল্যান্ডে ব্যবসায়ী থেকে প্রধানমন্ত্রী হন থাকসিন সিনাওয়াত্রা। সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারালেও প্রভাব হারাননি।
তার বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। পরে তাঁদের পরিবারের নতুন প্রজন্ম থেকে পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রাও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। তিন সদস্য, এক রাজনৈতিক ঐতিহ্য।
উত্তর কোরিয়ায় কিম পরিবার
একেবারে ভিন্ন ধারার গল্প উত্তর কোরিয়ায়। প্রতিষ্ঠাতা নেতা কিম ইল-সাং থেকে শুরু। তাঁর পর ছেলে কিম জং-ইল, তারপর নাতি কিম জং-উন—তিন প্রজন্ম ধরে একই পরিবার রাষ্ট্রক্ষমতায়।
গ্রিসে পাপানড্রেউ পরিবার
গ্রিসে জর্জিয়োস পাপান্দ্রেউ, তাঁর ছেলে আন্দ্রেয়াস পাপান্দ্রেউ এবং নাতি জর্জ পাপান্দ্রেউ—তিন প্রজন্মের প্রধানমন্ত্রী। যেন রাজনীতিই তাঁদের পারিবারিক পেশা।
ইতিহাস বলে, রাজনীতি কখনও কেবল ব্যক্তির নয়—কখনও তা হয়ে ওঠে পারিবারিক উত্তরাধিকার। কোথাও গণতান্ত্রিক ভোটে, কোথাও বিপ্লব বা সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে—তবু এক বিষয় স্পষ্ট:
ক্ষমতার চূড়ায় ওঠা যত কঠিন, সেই উত্তরাধিকার ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন।
আপনি চাইলে এটিকে আমি কলামধর্মী লেখা, প্রেজেন্টেশন স্ক্রিপ্ট বা ইউটিউব ভিডিওর স্ক্রিপ্ট আকারেও সাজিয়ে দিতে পারি।

