২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিষাদময় দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে ঢাকা সেনানিবাসের ৬ মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উচ্ছেদ। প্রায় ৩৮ বছরের স্মৃতিবিজড়িত সেই বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বের করে দেওয়ার সেই ঘটনাটি ছিল তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রীর জন্য এক চরম অবমাননা ও আঘাত।
১৯৭২ সাল থেকে এই বাড়িতে বাস করতেন জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালে তার শাহাদতের পর জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্তে নামমাত্র মূল্যে বাড়িটি খালেদা জিয়াকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই ইজারা বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত ২০১০ সালে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে উচ্ছেদে রূপ নেয়।
অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়াটি ছিল সুপরিকল্পিত। এতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, বিচার বিভাগ, সামরিক বাহিনী এবং গণমাধ্যমের একটি অংশের সমন্বিত ভূমিকা ছিল:
শেখ হাসিনা: ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক আক্রোশ থেকে এই উচ্ছেদের মূল নির্দেশদাতা হিসেবে তাকে গণ্য করা হয়। তিনি প্রকাশ্য জনসভায়ও এই উচ্ছেদের বিষয়ে তার জেদের কথা স্বীকার করেছিলেন।
মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক: শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে উচ্ছেদের কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া সামাল দেওয়ার ছক তৈরি করেন।
নিচে উল্লিখিত বিচারপতিদের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ শুনানি ছাড়াই একতরফা রায় দিয়ে উচ্ছেদ প্রক্রিয়াকে আইনি বৈধতা দিয়েছিলেন:
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক: (বর্তমানে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত ও কারাগারে)।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ও মোজাম্মেল হক। বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা: যিনি উচ্ছেদ পরবর্তী আদালত অবমাননার মামলাটিও শুনানি করতে দেননি। মোহাম্মদ আবদুল মুবীন (সাবেক সেনাপ্রধান): উচ্ছেদের সময় সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন। মোল্লা ফজলে আকবর (তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান): পুরো অপারেশনের গোয়েন্দা নজরদারি ও মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব দেন। লে. কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান: অভিযানে সরাসরি অংশ নেন এবং খালেদা জিয়াকে “জোর করে বের করে আনার” হুমকি প্রদান করেন। মেজর জেনারেল (অব.) জিয়া আহমেদ: রাওয়া ক্লাবে সাবেক কর্মকর্তাদের জড়ো করে উচ্ছেদের পক্ষে জনমত ও সমর্থন তৈরির কাজ করেন।
জ ই মামুন (সাংবাদিক): উচ্ছেদের পর বাড়ি থেকে ‘মদ উদ্ধারের নাটক’ সাজিয়ে বিতর্কিত প্রতিবেদন প্রচার করেন। সৈয়দ বোরহান কবীর (সাংবাদিক): লেখনীর মাধ্যমে উচ্ছেদের সপক্ষে যুক্তি এবং প্রোপাগান্ডা তৈরি করেন।
উচ্ছেদের সময় খালেদা জিয়ার বেডরুমে বসে থাকার এবং কান্নাজড়িত কণ্ঠে “আমি কেন বের হয়ে আসব? এটা আমার বাড়ি” বলার সেই মুহূর্তটি আজও সমর্থকদের হৃদয়ে দাগ কেটে আছে। সংবাদ সম্মেলনে তার সেই আর্তনাদ— “আমাকে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে”—তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক চরম নির্মমতার স্বাক্ষর বহন করে। মঈনুল রোডের সেই বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর তিনি গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় ওঠেন, যা বর্তমান সময় পর্যন্ত তার ঠিকানা হিসেবে পরিচিত।

