ঢাকার অমর একুশে বইমেলা-এ শুক্রবার ছিল তৃতীয় শিশুপ্রহর। সকাল থেকেই মেলায় ভিড় জমাতে শুরু করে ছোট ছোট শিশু। কেউ এসেছে বাবা–মায়ের হাত ধরে, কেউ আবার স্কুলশিক্ষকের সঙ্গে। সারি সারি বইয়ের স্টল ঘুরে তারা খুঁজে বেড়াচ্ছে গল্প, ছড়া, রূপকথা কিংবা বিজ্ঞানভিত্তিক বই। অনেকেরই এটাই প্রথম বইমেলায় আসা—বইয়ের এত বিশাল সমাহার দেখে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে তারা।
শিশুপ্রহরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল পাপেট শো। বেলা সাড়ে ১১টায় কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার-এর মঞ্চে শুরু হয় এই আয়োজন। ছোট ছোট রঙিন পুতুল আর পাখির মাধ্যমে শিশুদের সামনে তুলে ধরা হয় শিক্ষণীয় গল্প—যেখানে সততা, বন্ধুত্ব আর পরিবেশ রক্ষার বার্তা ছিল স্পষ্ট।
গল্পের মাঝেই মঞ্চে আসে পাপেট চরিত্র ‘আলো’। সে তার বন্ধু ‘গগলু’-কে খুঁজতে থাকে। তখন সামনে বসে থাকা শিশুরা একসঙ্গে ডাকতে শুরু করে—“গগলু তুমি এসো, আমরা তোমার গল্প শুনব।” মুহূর্তের মধ্যেই মঞ্চে হাজির হয় গগলু। শিশুদের হাততালি আর উচ্ছ্বাসে তখন চারপাশ মুখর হয়ে ওঠে। গগলু জানায়, তাদের সঙ্গে নাকি বাঘ মামাও এসেছে। গল্পের ফাঁকে সে শিশুদের উপদেশ দেয়—বই পড়তে, গাছ লাগাতে, বাবা–মায়ের কথা শুনতে এবং মোবাইলে গেমস না খেলতে।
এই পাপেট শো দেখতে খিলগাঁও থেকে মেলায় আসে শিশু তাইয়েমা হোসেন। তার মা তাহরিমা আক্তার মেয়েকে নিয়ে এসেছেন মেলায় ঘুরতে। পাপেট শো দেখে তাইয়েমা উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে, পুতুলগুলো কথা বলে আর গল্প বলে—এটা দেখতে তার খুবই ভালো লাগে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া তাইয়েমা মেলা থেকে কিনেছে গল্প, রূপকথা আর ভূতের গল্পের বই।
মেলার এই আনন্দমুখর পরিবেশের কেন্দ্র ছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। পাপেট শোর পাশেই বসানো হয়েছিল ছোট একটি বায়োস্কোপ। সেখানে ‘কুঁজো বুড়ির গল্প’ দেখতে ভিড় জমায় শিশুরা। চোখ বড় বড় করে তারা দেখছিল শিয়াল, বাঘ আর দাদুকে নিয়ে মজার সেই গল্প।
বায়োস্কোপ দেখতে যাত্রাবাড়ী থেকে আসে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী জারা। তার মা জুলেখা আক্তার জানান, মেয়ের বই পড়ার প্রতি আগ্রহ অনেক। অন্য বাচ্চারা যেখানে মোবাইল দেখতে চায়, সেখানে জারা বই পড়তেই বেশি পছন্দ করে। মেলা থেকে সে কিনেছে ‘বিড়াল আর ইঁদুরের গল্প’, ‘ঝন্টুর ছোট মামা’, ‘বাবুই ও জোনাকি’ এবং কয়েকটি সায়েন্স ফিকশন বই।
শুধু পরিবার নয়, শিক্ষকেরাও শিশুদের নিয়ে এসেছেন মেলায়। উত্তরা-র আকিজ ফাউন্ডেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ১৬ জন অবহেলিত শিশুশিক্ষার্থীকে নিয়ে আসেন শিক্ষক ইম্মত আরা ও কাণিজ হোসেন। স্কুলটিতে প্রায় ৪৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের অনেকেই আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের। স্কুলের নির্দিষ্ট বাজেট থেকে এই শিশুদের পছন্দমতো বই কিনে দেওয়া হয়।
শিক্ষক কাণিজ হোসেন শিশুদের জন্য কিনে দেন ঠাকুমার ঝুলি, গল্পে গল্পে জ্ঞান এবং নির্মলেন্দু গুণ ও আল মাহমুদ-এর নির্বাচিত ছড়া। শিশুদের মধ্যে মিম নামের এক শিক্ষার্থী আনন্দে বলল, মেলায় আসতে পেরে তার খুব ভালো লাগছে, সে আবারও এখানে আসতে চায়।
মেলার আজ ছিল নবম দিন। প্রতি শুক্র ও শনিবার শিশুপ্রহর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বেলা ১১টায় মেলার দ্বার খুলে শিশুপ্রহর চলে দুপুর ১টা পর্যন্ত। এরপর রাত ৯টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে মেলা।
আসাদুজ্জামান আশিক বলেন, তাদের উদ্দেশ্য হলো শিশুরা যেন মোবাইলে গেমস না খেলে বই পড়ে, মাঠে খেলাধুলা করে এবং আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষা লাভ করে। এদিন পাপেট শোতে মঞ্চস্থ হয় ‘বল্টু মামা ও তার সাঙ্গপাঙ্গ’ ও ‘বন ভ্রমণ’। গল্প পাঠ করেন রশীদ হারুন।
শিশুদের হাসি, গল্প আর বইয়ের প্রতি আগ্রহে দিনভর প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে বইমেলার তৃতীয় শিশুপ্রহর।

