ফাহাদ সবসময় হাসিখুশি ছিল। ছোটবেলা থেকেই সে নতুন কিছু দেখতে, নতুন কিছু শিখতে খুবই উৎসুক ছিল। কিন্তু তার মনের ভিতর ছিল একটিই বড় ইচ্ছা, সেটি হলো বিদেশে যেতে পারা, একটি নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখা। ফাহাদের দুই মামা দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্যবসা করে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছেন। ফাহাদও চেয়েছিল সেই পথেই চলতে চেয়েছিলেন।
তার বাবা, নুর মোহাম্মদ, সবসময়ই তার সন্তানদের জন্য সেরাটা চেয়েছেন। কিন্তু ছেলে যখন দক্ষিণ আফ্রিকার স্বপ্ন দেখল, বাবা নিজেও বাধ্য হলেন ছেলের ইচ্ছা পূরণের জন্য। বিভিন্ন উৎস থেকে ৯ লাখ টাকা জোগাড় করে তিনি ফাহাদকে দালালের মাধ্যমে পাঠানোর আয়োজন করলেন।
৩০ জানুয়ারি ফাহাদ ঢাকার বিমানবন্দর থেকে আফ্রিকার উদ্দেশে রওনা হল। প্রথমে ইথিওপিয়া, এরপর জিম্বাবুয়ে হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা তার স্বপ্নকে ভিন্ন পথে নিয়ে গেল। দালালেরা তাকে ইথিওপিয়া থেকে জঙ্গলের পথ ধরে জিম্বাবুয়ে পৌঁছে দিল। সেখান থেকে আরও অনেক দেশ ঘুরিয়ে, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তিনি চললেন সড়কপথে। দীর্ঘ যাত্রা, অনাহার, অসুস্থতা—সবই তার শরীরকে কষ্ট দিয়েছে।
ফাহাদের বাবা, নুর মোহাম্মদ, ১৫ ফেব্রুয়ারি সকালে ফোন পেয়ে জানতে পারলেন যে ফাহাদ দক্ষিণ আফ্রিকার মুসিনা শহরে পৌঁছেছে। একটি কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছে—এই খবর পেয়ে তার মনে স্বস্তির অনুভূতি জাগে। কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। রাতে অপরিচিত এক ফোনে জানানো হলো, ফাহাদ আর নেই।
নুর মোহাম্মদ তখন অবর্ণনীয় দুঃখে ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, “আমি কখনো ছেলেকে কোনো অভাব দেখাইনি। বলতাম, পড়ালেখা কর। কিন্তু সে দক্ষিণ আফ্রিকা যেতে চাইত। এখন আমার ফাহাদ আর নেই।”
ফাহাদের সঙ্গে দেওয়া ২০০ ডলার এবং ব্যাগে রাখা শুকনো খাবারও জঙ্গলের পথে ছিনতাই হয়ে যায়। স্বপ্নের পথে সে একা, কষ্টে, অনাহারে হেঁটে যাত্রা করেছে। বাবার সমস্ত চেষ্টা, সমস্ত ত্যাগ—সবই শেষ হয়ে যায় এক মুহূর্তে।
নুর মোহাম্মদ এখন শুধু চোখের জল আর নিঃশ্বাসে তার ছেলে ফাহাদের খোঁজ রাখেন। তিনি চেয়েছিলেন, অন্তত শেষবারের মতো ছেলেকে দেখতে। কিন্তু জীবন তার ইচ্ছাকে তাড়া করে চলে গেছে। হাসিখুশি, প্রাণবন্ত ফাহাদের জীবন শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেছে—একটি স্বপ্নের যাত্রা যা কখনো পূর্ণ হলো না।

