বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের অস্থিরতা যখন বাড়তে শুরু করল, তখন তার প্রভাব এসে পড়ল বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারেও। মানুষজনের মনে একধরনের উদ্বেগ তৈরি হলো—দেশে কি জ্বালানি সংকট হবে? এই আশঙ্কা থেকেই অনেকেই বাড়তি ডিজেল কিনে মজুত করতে শুরু করলেন। ফলে হঠাৎ করেই পেট্রল পাম্পগুলোতে তেলের বিক্রি বেড়ে গেল।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন—বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) হিসাব করে দেখল, মাত্র চার দিনেই প্রায় ৯৮ হাজার টন ডিজেল বিক্রি হয়ে গেছে। অথচ গত বছর একই সময়ে বিক্রি হয়েছিল মাত্র ৫৫ হাজার টন। যদিও উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো পরিস্থিতি তখনও তৈরি হয়নি। কারণ দেশে তখনও প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার টন ডিজেল মজুত ছিল। উপরন্তু, কিছুটা দেরি হলেও আগামী সপ্তাহে কয়েকটি ডিজেলবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা ছিল।
একই সময়ে পেট্রল ও অকটেনের বিক্রিও বেড়ে যায়। চার দিনে প্রায় ৯ হাজার ৩৮০ টন পেট্রল বিক্রি হয়, যেখানে গত বছর একই সময়ে ছিল ৬ হাজার ৪৮০ টন। অকটেন বিক্রি হয়েছিল প্রায় ৮ হাজার টন, যা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি। তবে এ নিয়ে তেমন দুশ্চিন্তা ছিল না, কারণ পেট্রল ও অকটেন দেশের ভেতরেও উৎপাদন করা হয়।
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ একদিন সাংবাদিকদের বললেন, দেশে জ্বালানির কোনো প্রকৃত সংকট নেই। বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার আগাম সতর্কতা হিসেবে সরবরাহ প্রায় ১০ শতাংশ কমিয়েছে। পাশাপাশি খোলাবাজার থেকে বেশি দাম হলেও বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি কেনা হচ্ছে।
এরই মধ্যে সরকার দুটি এলএনজি কার্গো কিনে ফেলল। এর একটি সরবরাহ করবে সিঙ্গাপুরের Vitol Asia, যারা প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম নিচ্ছে প্রায় সাড়ে ২৪ ডলার। অন্যটি দেবে Gunvor Group, তাদের প্রতি ইউনিট দাম প্রায় ২৮ ডলার। অথচ যুদ্ধ শুরুর আগে এই এলএনজি কেনা হচ্ছিল প্রায় ১০ ডলার করে। তবুও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার এই ব্যয় মেনে নিয়েছে।
এদিকে কাতার থেকে আসার কথা থাকা দুটি এলএনজি কার্গো বাতিল হয়ে যায়। কারণ কাতার হঠাৎ করে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এতে গ্যাস সংকটের আশঙ্কা বাড়লেও নতুন কেনা এলএনজি দিয়ে মার্চ মাসের সরবরাহ ধরে রাখা যাবে বলে আশা করছিল পেট্রোবাংলা।
গ্যাসের পাশাপাশি রান্নার গ্যাস বা এলপিজি নিয়েও কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। এর আগেও ডিসেম্বরের দিকে সরবরাহ কমে গিয়ে জানুয়ারিতে বড় সংকট তৈরি হয়েছিল। তখন ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি হয়ে গিয়েছিল। পরে সরকার বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে বাড়তি এলপিজি আমদানির অনুমতি দিলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। তবুও বাজারে তখনও সিলিন্ডার প্রতি প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছিল, যদিও সরকার নির্ধারিত দাম ছিল ১,৩৪১ টাকা।
এই পরিস্থিতিতে জ্বালানিমন্ত্রী এলপিজি আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ব্যবসায়ীরা জানালেন, অনেক কোম্পানি প্রায় এক বছর ধরে এলপিজি আমদানি করছে না। কারও ব্যাংক হিসাব জব্দ থাকায় ঋণপত্র খুলতে পারছে না। ফলে আমদানি কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
তবে কিছু প্রতিষ্ঠান পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসে। বিশেষ করে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ–এর ফ্রেশ ব্র্যান্ডের এলপিজি কোম্পানি ওই মাসে প্রায় ৩৫ হাজার টন এলপিজি আমদানি করার উদ্যোগ নেয়। যদিও বিশ্ববাজারে এলপিজির দাম খুব বেশি না বাড়লেও জাহাজভাড়া হঠাৎ বেড়ে যায়। প্রতি টন এলপিজি আনতে পরিবহন খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২৭৫ ডলার, যেখানে আগে হিসাব করা হয়েছিল ১২০ ডলার।
মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেছিলেন, মার্চ মাস পর্যন্ত দেশে এলপিজির বড় কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই। তবে তাদের চিন্তা এপ্রিল মাসকে ঘিরে। তাই তারা ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করেন।
এদিকে সরকারও বসে থাকেনি। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় তিনটি খাতে জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশনা দেয়—গ্যাস, জ্বালানি তেল এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার। মানুষকে বলা হলো রান্না ও অন্যান্য কাজে গ্যাস যতটা সম্ভব সাশ্রয় করতে। গ্যাসচালিত যন্ত্রের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার বন্ধ করতে এবং পাইপলাইন ও বার্নার নিয়মিত পরীক্ষা করতে। জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
সরকারি অফিসগুলোতেও নতুন নির্দেশনা আসে—অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা, গাড়ির ব্যবহার সীমিত করা এবং এয়ারকন্ডিশনারের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখা। যুদ্ধের অস্থির সময়েও তাই দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি পুরোপুরি সংকটে পড়েনি। বরং সতর্কতা, বিকল্প উৎস থেকে আমদানি এবং সাশ্রয়ী ব্যবহারের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলতে থাকে।

