সাজ্জাদ হোসেন, টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি:
আয়তন, বাণিজ্যিক গুরুত্ব ও স্থানীয় অর্থনীতিতে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো হাট-বাজার ব্যবস্থা।
বিশেষ করে টাংগাইল জেলায় কৃষি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিভিন্ন হাট দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। আয়তনের দিক থেকে টাঙ্গাইল জেলার সবচেয়ে বড় ১০টি হাট কেবল লেনদেনের স্থান নয়, বরং এগুলো আঞ্চলিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। নিচে আয়তনভিত্তিক শীর্ষ ১০টি হাটের বিস্তারিত তথ্য।

১. করটিয়া হাট (১২.২২২৫ একর) – সর্ববৃহৎ
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার করটিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত করটিয়া হাট জেলার সর্ববৃহৎ হাট হিসেবে স্বীকৃত। ১২.২২২৫ একর আয়তনের এই বিশাল হাটে সাপ্তাহিক নির্ধারিত দিনে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য—ধান, চাল, পাট, সবজি, গরু-ছাগলসহ বিভিন্ন গবাদিপশু—কেনাবেচা হয়। পাশাপাশি বস্ত্র, মসলা, মাছ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাইকারি ও খুচরা বাজারও এখানে গড়ে উঠেছে। বৃহৎ আয়তন এবং যোগাযোগ সুবিধার কারণে আশপাশের একাধিক উপজেলা থেকেও ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা এখানে সমবেত হন। এটি শুধু যে টাংগাইলে সবচেয়ে বড় হাট তা নয় এটি বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তর কাপড়ের হাট।
২. কোনাবাড়ী হাট, গোপালপুর (৮.৪১ একর)
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে গোপালপুর উপজেলার কোনাবাড়ী হাট। ৮.৪১ একর আয়তনের এই হাট কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। ধান-পাট ও মৌসুমি ফসলের পাশাপাশি গবাদিপশুর বেচাকেনা এখানে উল্লেখযোগ্য।

৩. ধনবাড়ী হাট, ধনবাড়ী (৭.৬৯ একর)
তৃতীয় বৃহত্তম হাট ধনবাড়ী উপজেলার ধনবাড়ী হাট, যার আয়তন ৭.৬৯ একর। ঐতিহ্যবাহী এই হাটে স্থানীয় কৃষিপণ্য ছাড়াও বিভিন্ন গ্রামীণ হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালিত হয়। উপজেলা পর্যায়ের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র এটি।
৪. সুনামগঞ্জ (গারোবাজার) হাট, মধুপুর (৬.৮০ একর)
মধুপুর উপজেলার মহিষমারা ইউনিয়নে অবস্থিত সুনামগঞ্জ বা গারোবাজার হাট ৬.৮০ একর আয়তন নিয়ে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। পাহাড়ি ও সমতল এলাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এখানে কৃষিপণ্যের পাশাপাশি বনজ পণ্য ও ফলমূলের লেনদেনও হয়ে থাকে।
৫. লাউহাটী হাট, দেলদুয়ার (৬.৭৫ একর)
দেলদুয়ার উপজেলার লাউহাটী হাট ৬.৭৫ একর আয়তন নিয়ে পঞ্চম স্থানে। এটি স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। বিশেষ করে ধান, সবজি ও গবাদিপশুর বেচাকেনায় এ হাটের সুনাম রয়েছে।
৬. সাগরদিঘী হাট, ঘাটাইল (৬.৭০ একর)
ঘাটাইল উপজেলার সাগরদিঘী হাট ৬.৭০ একর আয়তন নিয়ে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে। কৃষিপণ্য ছাড়াও মাছ, মুরগি ও বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর বড় বাজার হিসেবে এটি পরিচিত।
৭. বল্লা হাট, কালিহাতি (৬.৩১ একর)
কালিহাতি উপজেলার বল্লা ইউনিয়নের বল্লা হাট ৬.৩১ একর আয়তন নিয়ে সপ্তম স্থানে। এই হাটে স্থানীয় কৃষিপণ্যের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতির বিভিন্ন উপাদান যেমন—কাঠ, বাঁশ ও গৃহস্থালি সামগ্রী—লেনদেন হয়।
৮. বড়চওনা হাট, সখিপুর (৫.৭০ একর)
সখিপুর উপজেলার বড়চওনা ইউনিয়নে অবস্থিত বড়চওনা হাট ৫.৭০ একর আয়তনের। এটি আশপাশের গ্রামগুলোর কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।
৯. মরিচাহাট, কালিহাতি (৫.৬৩ একর)
কালিহাতি উপজেলার নাগবাড়ী ইউনিয়নের মরিচাহাট হাট ৫.৬৩ একর আয়তন নিয়ে নবম স্থানে রয়েছে। নিয়মিত হাটবারে এখানে ব্যাপক বেচাকেনা হয় এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।
১০. হাঁটুভাঙা হাট, মির্জাপুর (৫.৬০ একর)
মির্জাপুর উপজেলার আজগানা ইউনিয়নের হাঁটুভাঙা হাট ৫.৬০ একর আয়তন নিয়ে দশম স্থানে। এটি স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারকেন্দ্র, যেখানে মৌসুমি ফল-ফসল ও নিত্যপণ্যের বড় আকারের লেনদেন হয়।
টাঙ্গাইল জেলার এই শীর্ষ ১০টি হাট কেবল আয়তনের দিক থেকেই বড় নয়, বরং জেলার সামগ্রিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কৃষিপণ্য বিপণন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বিকাশ এবং স্থানীয় রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে এসব হাটের ভূমিকা অপরিসীম। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব হাটকে আরও আধুনিক ও কার্যকর বাণিজ্যকেন্দ্রে রূপান্তর করা সম্ভব—যা ভবিষ্যতে টাঙ্গাইলের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে আরও ত্বরান্বিত করবে।


